গানের কবি নজরুল


Kazi_nazrul_islamবিদ্রোহ, প্রেম, বিরহ আর তারুণ্যের কবি নজরুল বাংলা গানের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় এক নাম। বাংলা সঙ্গীতে সমৃদ্ধির প্রশ্নে এবং সাম্যবাদী সত্তা হিসেবে তিনি আমাদের গানের কবি, বিচরণক্ষেত্রে পরিধি হিসেব করলে তিনি আমাদের প্রাণের কবি। কবির রচিত প্রায় তিন হাজার গানথেকে বিদ্রোহের মাঝে যে ভাঙার আবেগ, অস্বীকৃতির ব্যকুলতা, শেকল ছেঁড়ার প্রবনতা, বাঁধনহারা উদ্যম আর সুরের পৃথিবীর অবস্থান তাকে খুব সহজেই খুঁজে নেয়া যায়। নজরুলের এই পৃথিবী হচ্ছে ছন্দের পৃথিবী, প্রেমের পৃথিবী আর সাম্যবাদী সুরে মানুষের ঐক্যের পৃথিবী। বলতে গেলে নজরুল রচিত সংগীতগুলো বাংলা গানকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। নজরুলের বৈচিত্র্যময় সুর-তাল-লয় ও বিষয়বস্তুর গানের পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে এক মহান ঐক্যের ধ্যান এবং গঠনমূলক স্বপ্ন। প্রচলিত শোষণ ভিত্তিক সমাজের ভগ্ন-জীর্ণ-অবক্ষয় জর্জরিত কাঠামোটি ভেঙে ফেলে নতুন কিছু গড়ে তোলার দুর্নিবার উদ্দীপনা রয়েছে নজরুলের গানে।
নজরুলের গান প্রেমের কথা বলে, এই গান ঝিমিয়ে পড়া দেহে প্রাণ সঞ্চার করে আর সেখানে ধ্বনিত বিদ্রোহের সুর নাড়িয়ে দেয় অত্যাচারীর মসনদ। এক্ষেত্রে তাঁর রচনার কাব্যিক সৌজন্যবোধ, অপূর্ব ছন্দ ও হৃদয়স্পর্শী লয়ের সাথে আশ্চর্য একটি ভাবের মিল আছে। একটু গভীর থেকে চিন্তা করলে নজরুলের রচনাগুলো এক বৃহত্তর ঐক্যসূত্রে বিধৃত। সিপাহী নজরুল যে হাতে অস্ত্র ধরে বধ করেছেন শত্র“কে ঠিক সে হাতেই আবার বাঁশীও বাজাতেন তাইতো তাঁর কাব্যে যুগপথ প্রেম-বিরহের সুর। তাঁর এক চোখে যখন ক্রোধের অগ্নিশিখা ঝলক দিয়ে উঠেছে ঠিক তখনই মানবতার জন্য অন্য চোখ তখন হয়ে উঠেছে অশ্র“সজল।
বেশিরভাগ সংগীত প্রণয় কিংবা বিরহের ইতিবৃত্ত হিসেবে রচিত হলেও তাঁর রচনায় কাব্যগীত আর প্রেমগীতি হয়ে ওঠে নিতান্তই সমার্থক। এখানে এক দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ কবিসত্তার মধ্যেও আমরা অনুরণিত হতে দেখি তাঁর হৃদয়ের স্পন্দন,আনন্দের বহি:প্রকাশ, দুঃখ-বেদনা এবং আশা-নৈরাশ্যের বৈকুন্ঠে অবগাহনের এক আকুতি। কাব্যসংগীতের বিষয়টি একান্ত ব্যক্তিগত হলেও নজরুল এর পরিসরকে অনেক বিস্তৃত করে তুলেছেন যা বাড়িয়ে দিয়েছে এর প্রাণ ও মর্মস্পর্শীতা।
আদি নিবাস পারস্যে প্রেম সংগীতের রূপদান করার জন্য সৃষ্টি হলেও নজরুলের হাত ধরে কয়েকটি সার্থক গজল আমরা পেয়েছি। বিষয়, ভাববস্তু ও দর্শনের কথা বিচার করতে গেলে যার রয়েছে ভিন্নার্থক ব্যাঞ্জনা। গজলে ভাবের যে লঘু ভঙ্গি সঞ্চরণশীল তা বাংলা কাব্যে ঠাঁই করে নেয় নজরুলের হাতেই। পারসিক শায়েরকে মাতৃভাষায় আত্মস্থ করে প্রয়োজন অনুযায়ী নানাস্থানে উপযুক্ত সুর-তাল-লয়ের সংযোগে নজরুলের বাংলা গজলকে সিক্ত করেছেন ভিন্ন রসে। তাইতো নজরুলের গজল নির্ভর সংগীতে মানবিক আবেগের গভীরতার সাথে খুঁজে পাওয়া যায় দেশী মাধুর্যের বিস্ময়কর এবং স্বকীয় এক অবস্থান।
প্রয়োজনকে সামনে রেখে আবছা করে আরবি, ফারসি শব্দের সুন্দর সমন্বয় নজরুলের গজলগুলোর অন্যতম স্বকীয়তা। তাইতো গানগুলোতে প্রাণের ছোঁয়ায় সিক্ত হয়ে উঠেছে গভীর প্রেমের ইতিকথা। অন্যদিকে বিরহ, যন্ত্রণা, ভাববিড়ম্বনার বিষাদ-সিন্ধু আর কাল্পনিক নৈনিতালে নজরুলের গজল হয়ে উঠেছে অনন্য এক ভঙ্গিমার অসাধারণ উপস্থাপনা। অন্যদিকে শব্দ, উপমার ব্যবহার, ছন্দ আর স্তবক বিন্যাসের অনন্যতা একে দিয়েছে এক স্বকীয় পরিমণ্ডল যেখানে উর্দু ও ফারসি গজলের প্রাণ টুকুও রয়েছে অক্ষুন্ন। তাইতো আসিলে এ ভাঙা ঘরের মত গানগুলো সত্যি সব রীতিকে ভেঙে বাজিয়েছে সৃষ্টিশীলতার মৃদঙ্গ। আর নজরুলের দেখা সে স্বপ্নের বেসাতি ছড়িয়ে বাংলাগান তার সমৃদ্ধির পথে এগিয়েছে এক আলোকবর্ষ পথ। তাই তিনি আমাদের প্রাণের কবি, গানের কবি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s