TOTA-RAJ-PHOTO-17-02-14-07

ঐতিহ্যের কলাই রুটি


TOTA-RAJ-PHOTO-17-02-14-07বাংলাদেশের বেশির ভাগ চরাঞ্চলের পলিমাটিতে কলাইয়ের ফলন ভালো হয়। এখানে ডাল হিসেবে চাহিদা পূরণের পরও অনেক কলাই উদ্বৃত্ত থেকে যায়। মানুষ তাদের স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটানোর পর সে কলাই বিক্রি করে বাইরের বাজারে। অনেক সময় অতিরিক্ত উত্পাদনের পাশাপাশি বিপণন অতটা সহজ না হওয়ায় উদ্বৃত্ত কলাই নিজেদের খাদ্যতালিকায় স্থান দিতে গিয়ে কলাইয়ের রুটি তৈরির পদ্ধতি আয়ত্ত করে চরাঞ্চলের মানুষ।
বিশেষ করে তাদের পক্ষে গমের আটা কিনে রুটি খাওয়া কিংবা গম চাষ করা কঠিন। অন্যদিকে কলাইয়ের উত্পাদন থাকে পর্যাপ্ত। এর রুটি তৈরি করাও গমের আটার রুটি থেকে অনেক বেশি সহজ। তাই তারা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় স্থান দেয় এ রুটি।
রুটি তৈরির জন্য দুই ভাগ কলাইয়ের গুঁড়োর সঙ্গে এক ভাগ চালের আটা মিশিয়ে পানি দিয়ে ভালো করে মাখা হয়। এমনিতে রুটি তৈরির জন্য আটা থেকে খামির তৈরি যেমন জটিল কাজ, কলাইয়ের রুটি তৈরিতে তেমন ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয় না। শুধু মাখানো নরম আটা পরিমাণ মতো নিয়ে দুই হাতের তালুতে নিয়ে টানতে হয়। এরপর উপযুক্ত কৌশলে ডানে-বাঁয়ে টেনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনেকটা গোলাকার এ রুটি তৈরি করা হয়।
আটার রুটি সেঁকার জন্য যেমন সুগঠিত তাওয়ার দরকার হয়, কলাইয়ের রুটির ক্ষেত্রে তেমনটি লাগে না। একটি পরিষ্কার মাটির খোলায় অল্প তাপে খুব সহজেই সেঁকে নেয়া যায় এ রুটি। অন্যদিকে আটার রুটি খাওয়ার জন্য সঙ্গে ভাজি, তরকারি বা অন্য উপাদানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কলাইয়ের রুটি তৈরির সময় যে লবণ ব্যবহার করা হয়, তার সঙ্গে অতিরিক্ত তেমন কোনো মসলা না মেশালেও শুধু সেঁকে নিলে তা খাবার উপযোগী হয়ে ওঠে। তবে চরাঞ্চলের মানুষ কলাইয়ের রুটি খাওয়ার জন্য সহজলভ্য বাটা কাঁচামরিচ এবং অতিরিক্ত লবণ বেশি ব্যবহার করে। অনেক সময় মরিচের দাম খুব বেশি হলে শুধু লবণ দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে দেখা যায় তাদের।
নাটোর, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা বিশেষত চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিয়াড় অঞ্চলের পাশাপাশি পুরো চলনবিল এলাকায় সুস্বাদু খাবার হিসেবে সমাদৃত এ রুটি। অন্যদিকে তাদের সকালের নাশতায় এ কলাইয়ের রুটি অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিল বলে জানা যায়।
চর অঞ্চলের বাইরের মানুষ বাড়িতে কলাইয়ের রুটি তৈরি করে নিতান্ত মুখরোচক খাবার হিসেবে। তারা প্রতিদিন গমের আটার তৈরি রুটি খাওয়ার একঘেয়েমি দূর করতে তৈরি করে কলাইয়ের রুটি। এক্ষেত্রে রুটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য উদরপূর্তি না হওয়ায় তারা রসনার তৃপ্তিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের মসলার ব্যবহারে চেষ্টা চলে এর স্বাদ বৃদ্ধির।  পাশাপাশি তৈরি করা হয় সুস্বাদু সব চাটনি ও ভর্তা।
ভোজন রসিকরা শরষে বাটা, মরিচ বাটা, পেঁয়াজকুচি, বিট লবণ, ধনেপাতা ও সরিষার তেল মিশিয়ে তৈরি করা বিশেষ চাটনি সহযোগে এ রুটি খায়। অনেক ক্ষেত্রে পোড়া বেগুন ভর্তার সঙ্গেও খাওয়া হয়। কখনো গরু কিংবা মুরগির মাংসের ঝোল দিয়েও খাওয়া হয় এ রুটি। খাদ্যমানের দিক থেকে বেশ পুষ্টিকর এ রুটির সঙ্গে জনপ্রিয় হয়েছে শুঁটকির ভর্তা। রসনার স্বাদ ও রুচির পরিবর্তন চিরাচরিত অনেক রীতি পাল্টে দিলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অক্ষত থেকে গেছে আমাদের সংস্কৃতির শেকড়। বাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে তেমনিভাবে টিকে আছে এ কলাইয়ের রুটি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s