অদ্ভুত জাতি, তার অহেতুক অাবেগ


সময়টা ১৮৫৭, চলছে সিপাহী বিপ্লব। দোর্দণ্ড প্রতাপ লুটেরা পিশাচ ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে দলে দলে প্রাণ দিচ্ছেন বিপ্লবী ভারতবাসী। কটাক্ষ করে কয়েকজন ইংরেজ সেনা কর্মকর্তা বলেই বসলো সেন্টিমেন্টাল ফুলস। সত্যি এই তকমাটা সেই যে আমাদের উপর ঘোড়ার জিনের মত এঁটে বসেছে তার থেকে মুক্তির সুযোগ কোথায়। আমরা এখনো আবেগ প্রবণ জাতি। আমরা বাঁচতে শিখেছি অনেকটা এই আবেগের উপর ভর করে। তাইতো ক্রিকেটের মত তুচ্ছ একটি বিষয় আমাদের ভাবায়, আমাদের হাঁসায়-কাঁদায় সবাই মিলে মিশে উৎসব করার উপলক্ষ্য এনে দেয়। কিন্তু  জাতি হিসেবে আমাদের এই আবেগের মূল্য সাকিব-মুশফিকরা আর বুঝলো কোথায়? স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে এই বিষয়টি বলবেন সবাই কিন্তু আমি ভাবছি ভিন্ন কিছু বিষয় যার সাথে এই ব্যর্থতার গ্লানি একীভূত এবং পৌণপূণিক সম্পর্কিত করা যায়।

প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নির্বাচকমণ্ডলীর প্রতি। এখানে আরেকটু স্পষ্ট করে বলতে গেলে সবার আগে দৃষ্টি দেয়া দরকার দল নির্বাচনে তাদের দুর্নীতি ও স্বজণপ্রীতির প্রতি। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ জানেন বিগত কয়েক মাস যাবৎ বাংলাদেশ দলের পারফরমেন্স কিভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এবং এক্ষেত্রে জনৈক তামিম ইকবাল নামের পেটমোটা বেঢপ সাইজের ওপেনারের ভূমিকা কতটুকু সেটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা। বলতে গেলে তার চাচা আকরাম বর্তমান ক্ষমতসীন দলের কর্তাব্যক্তিদের সাথে দহরম-মহরম তো রাখেনই উপরন্তু সরাসরি উক্ত দলের কর্মী হিসেবেই পরিচিতি বোদ্ধা মহলে। পাশাপাশি যে জিম্বাবুয়ে নিজের ঘর গোছাতে ব্যর্থ সেখান থেকে হিথ স্ট্রিকের মত খেলোয়াড়কে কোন যুক্তিতে কোচ বানানো হলো সে প্রশ্নের উত্তর খোদ বাংলাদেশে টিম ম্যানেজমেন্টই দিতে পারবেন কিনা সন্দেহ রয়েছে।

ক্রিকেট ময়দানে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেন আর নাই পারেন নির্বাচক ও ব্যবস্থাপনা পর্যদের সদস্য হিসেবে নিজের অবস্থানটা বেশ শক্তভাবে জানান দিচ্ছেন তিনি। বলতে গেলে একক ক্ষমতাবলে দেশের সবথেকে বাজে পারফরমারকে দলে নিয়মিত করেছেন তিনিই। তামিম ইকবালের খেলার যোগ্যতা নিয়ে আমাদের কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু তার বাজে ফর্মের সময় তাকে ড্রপ করে নতুনদের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। কিংবা এখন বাংলাদেশের সাইড বেঞ্চে যেসব খেলোয়াড় থাকেন তাদেরও সুযোগ দেয়া যেতে পারে। কিন্তু সে সৎসাহস আমাদরে টিম ম্যানেজমেন্ট দেখালেন না। ফলে বরাবরের মত পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মাঠ ছাড়তে হচ্ছে আমাদের।

তবুও মান রেখেছে এই ছেলেটি।

বাংলাদেশে পেস বোলারের পাশাপাশি সংকট একজন ধীর-স্থির মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান যিনি বিপদের সময় অন্তত দলের হাল ধরবেন। তারপর লোয়ার মিডল অর্ডার এবং লেট অর্ডার নিয়ে পর্যুদস্ত দলের ব্যাটিং লাইনের চিড় মেরামত করবেন। পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য মমিনুল হকের মত একজন ধারাবাহিক পারফরমার দলে কখনোই নিয়মিত হতে পারেন নি। বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের দুর্বলতা গুলো ঠিক মত যাচাই করে পরে তার সমাধান করে কিন্তু আমরা দিনকে দিন সমস্যা বাড়িয়েই চলেছি।

পেস বোলারের সংকট বাংলাদেশের দীর্ঘদিন থেকেই। বলতে গেলে এইদিকে বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টের কোনো দৃষ্টি নেই। তারা বিভিন্ন স্পন্সর নিয়ে ব্যস্ত, কর্মচারী কর্মকর্তাদের বিভিন্নমুখী দলবদল আর নানাক্ষেত্রে নোংরা রাজনীতি করতেই তাদের দিন কেটে যায়। দিনের পর দিন ক্রিকেটার থেকে শুরু করে সবার বেতন ভাতা বাড়ে কিন্তু আমাদের দেশের খেলার মানোন্নয়ন হয়না। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের সাথে বলতে হয় দুইযুগ ধরে ক্রিকেট খেলেও বাংলাদেশ একমাত্র সাকিব আল হাসান বাদে দ্বিতীয় একজন পরিপূর্ণ ক্রিকেটার তৈরি করতে পারেনি। যেখানে এই সাকিবকে শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটার বলাটা এখন বোধকরি ভুলই হবে। কারণ সে তার বেশিরভাগ সময় ব্যায় করে নাইট রাইডার্স আর কাউন্টি ক্রিকেটের পেছনে।

ভৌগোলিক পরিসীমা ও পরিবেশের কারণে বাংলাদেশীদের উচ্চতা কম এটা মেনে নিয়েই পেস বোলার খোঁজার দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত ছিলো। বাংলাদেশের যে পরিবারগুলো ক্রিকেট খেলার ভক্ত সেখানে বাবা মা ছোট বেলা থেকেই চায় তাদের ছেলে ক্রিকেট খেললে দ্বিতীয় একজন সাকিব আল হাসান হোক। সেখানে মাশরাফি বিন মুর্তজা কিংবা ঐ রকম শক্তিশালী পেস বোলার হওয়ার ইচ্ছা তাদের অঙ্কুরেই মরে যায়। এটাকেও সরাসরি টিম ম্যানেজমেন্টের ব্যর্থতাই বলা যায়।

বাংলাদেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বাসকারী মুচি ও ধাঙড়দের পাশাপাশি প্রচুর আটকে পড়া পাকিস্তানি রয়েছেন। বলতে গেলে সুঠাম দেহের অধিকারী এদের শরীরের শক্তিমত্তা ও উচ্চতা বাঙালিদের থেকে অনেক বেশি। বাংলাদেশ সরকার যদি সত্যিই ক্রিকেটের প্রতি আন্তরিক হত তবে তারা চেষ্টা করতো এদের ক্রিকেটের সাথে সম্পৃক্ত করতে। কিন্তু প্রথমত জাতিগত বিদ্বেষ অর্থাৎ নিচু শ্রেণির মুচি-ধাঙোড়কে কেনো জাতীয় টিমে খেলাবো এই মাসনিকতায় তাদের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসা থেকে শুরু করে শাহবাগী উগ্রবাদীদের কারণে অকারণে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার ভয়ে চুপ থেকেছে ম্যানেজমেন্ট। শাহবাগীদের দাপটে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম বিশেষ দেশে খেলতে যাওয়া যেখানে বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের থেকে পেইজ বোলার বের করার সাধ্য সরকারের আর কোথায় থাকে। একটু উদারনৈতিকতার পরিচয় দিলে, সরকার আন্তরিক হলে অন্তত পেসবোলার সংকট আমাদের কেটে যেতো।

সবথেকে বড় দোষ আমাদের বাবা মায়ের। প্রত্যেকের জন্মের পার তার কপালে সিল মারা হয়ে যায়। মেয়ে জন্ম নিলে তাকে ডাক্তার হতে হবে আর ছেলে হলে অবশ্যই তাকে হতে হবে ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া থেকে বাণিজ্য অনুষদের দিকে গেলেও বাবা-মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়নি। ছোট বেলায় দেখা যায় শহুরে রোবট বাবা-মায়ের ছেলে মেয়েরা প্রাইভেট টিউটর থেকে শুরু করে টিভি-কম্পুটারেই জীবন কাটায়। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা বই বগলে করে দৌড়ায় প্রাইভেট টিউটরের কাছেই কিংবা রাস্তার মোড়ে মাচায় বসে আড্ডা দেয়, ইভটিজিং করে নয়তো সিনেমা হলে যায়। শহুরে ছেলেমেয়েদের স্কুল যাওয়ার শুরু থেকেই যে টিভির রিমোর্ট হাতে ওঠে সেটা ক্লাস ফোরে উঠতেই কম্পুটারের মাউসে গিয়ে ঠেকে। আর ধনীর দুলাল-দুলালীদের হাতে ওঠে আইপ্যাড থেকে শুরু করে আরো নিত্যনতুন স্মার্ট ডিভাইস। তাই দেশের ক্রিকেট ফুটবল চুলোয় যাক তাদের জীবন ধন্য হয় অন্যজগতে। তাইতো ক্লাস ফাইভ থেকেই তাদের সঙ্গী হয় ১৮+ ওয়েবসাইটের রগরগে ভিডিও।  যে বয়সে তাদের হাতে থাকার কথা ক্রিকেট বল আর ব্যাট তাদের হাত তখন অন্য কাজে ব্যস্ত।  উত্তেজক যৌনকর্মের ভিডিও দেখার পর তাদের হাত কাজ করে ঠিকই, তবে সেটা বাথরুমের গহীনে। নিজেদের যৌবন অকালে শেষ করার পাশাপাশি তাদের কল্যাণেই  জাতিকে দেখতে হচ্ছে ৫৮ রানে অলাআউটের লজ্জা। সেই সাথে তামিম ইকবালের মত স্ফীত উদরের বিগতযৌবনা ক্রিকেটার দর্শনকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘাঁও বলা যায়।

এখনি সময় সচেতন হওয়ার। বাবা-মা অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানকে জোর করে কোনো কাজ করতে বাধ্য না করা। সেই সাথে তাদের হাতে উপযুক্ত সময়ে অন্তত নিজেদের শরীর ঠিক রাখার জন্যও একটা ব্যাট-বল কিংবা ফুটবল তুলে দেয়া। অনর্থক এ+ এর ধান্দা না করে প্রকৃত শিক্ষার দিকে নজর দেয়াটা জরুরী। বাচ্চাদের হাতে ইন্টারনেট আর কম্পুটারনির্ভর ডিভাইস তুলে দেয়ার ফলাফল জাতি এখন হাতে নাতে পেতে শুরু করে করেছে। এরফলে রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায় ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া মেয়ে যেমন অকালে গর্ভবতী হচ্ছে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে দেশের গর্ব ক্রিকেট। সময় থাকতে সচেতন না হলে ক্রিকেট তো দূরের কথা আরো অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে দুর্দিন। ভাবতে অবাক লাগে অশ্লীল ভিডিও দূর থেকে দেখে মানুষ তার মনের খায়েশ যেমন মেটায় ওয়াশরুমের অন্ধকারে। তেমনি সুদুর ব্রাজিলে হওয়া বিশ্বকাপ দেখে নিজের মনের জ্বালা মেটায় বিল্ডিং এর ছাদে ওড়ানো পতাকায়। সত্যিই আমরা এক অদ্ভুদ জাতি, আর তার থেকেও অদ্ভুদ আমাদের আবেগ।

সালিম অর্ণব

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s