গুপ্তগোষ্ঠী ফ্রিম্যাসনারির কথা

গুপ্তগোষ্ঠী ফ্রিম্যাসনারির কথা


‘ফ্রিম্যাসনারি’ ও সংশ্লিষ্ট আরো কিছু গুপ্তগোষ্ঠীর কাহিনী যতোটা রহস্যঘেরা ও কিংবদন্তীতে আচ্ছন্ন তাদের নিয়ে আমার পড়ালেখার শুরুটা কিংবা এই গ্রন্থ প্রকাশের ঘটনা প্রবাহও তেমনি হয়ে গেছে অনেকটা গল্পের মতো, যা পাঠকদের না বললেই নয়। গ্রন্থটি প্রকাশের এক বছর আগেও ভাবিনি গ্রন্থ তো দূরের কথা এই জাতীয় একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করবো। গত বছর মার্চে বন্ধুদের সাথে আড্ডা জমেছিলো মিরপুর স্টেডিয়ামের কাছে পূর্ণিমা রেস্টুরেন্টে। বন্ধুদের মধ্যে আই.এফ.আই.সি ব্যাঙ্কের কর্মকর্তা রিফাত হাসান ঘটনাক্রমে আমাকে একদিন ফ্রিম্যাসনদের সম্পর্কে অনেক কিছু বললো। প্রতœতত্ত্বের শিক্ষার্থী হওয়ায় হয়তো কোনো কারণে ফ্রিম্যাসনারি বা হিরাম আবিফের নাম শুনেছিলাম কিন্তু তাতে আগ্রহী ওঠার যথেষ্ঠ কারণ ছিলো না। এমনকি রিফাত ঐদিন মনে না করলে স্মৃতি থেসে হারিয়েই যেতো এই বিষয়ক চিন্তা। ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব আর সমাজ-রাজনীতি নিয়েই আমাদের বেশিরভাগ আলোচনা চলতো প্রায় প্রতিদিন সন্ধাতে। ছোট্ট সিলেবাস আর নোট নির্ভর মুখস্থবিদ্যায় নির্যাতিত পাঠক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার প্রতি বিতৃষ্ণা জাগাটা ছিলো স্বাভাবিক। অন্যদিকে মাস্টার্সের পরীক্ষার প্রস্তুতি শেষ হয়ে যাওয়াতে অনেকটাই কাজকর্মের চাপমুক্ত হয়ে পরীক্ষায় অপেক্ষায় ছিলাম। ঠিক এই সময় থেকে ফ্রিম্যাসনারি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা শুরু করি। কিন্তু দিন গড়িয়ে যেতেই বুঝতে পারি এই বিষয়ে হুট করে কোনো কিছু লিখে ফেলা অতটা সহজ কাজ নয়।
বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও একীভূত করার ফাঁকে বিষয়টির প্রতি একরকম ধারণা জন্মায়। গত বছরের সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকার ঈদুল আযহা সংখ্যায় উক্ত বিষয়ে সুবিশাল একটি প্রবন্ধ স্থান পায় । প্রবন্ধটির অসম্ভবরকম পাঠকপ্রিয়তা আমাকে পথ দেখায়। আস্তে আস্তে বিষয় অনুসারে তথ্যগুলোকে সাজাতে থাকি। একটি সময় এসে শেষ হয় পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ। এই রকম একটি অজানা টপিকে রচিত বইটার ভূমিকা লিখতে কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। বিশিষ্ট্য লেখক সাবের ভাইকে বলতে উনি দেখিয়ে দিলেন আমারই শিক্ষক অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ স্যারকে। স্যারকে যথারীতি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ এবং বইটির পাণ্ডুলিপি পৌঁছে দিলাম। দীর্ঘ একমাসে নানা ব্যস্ততায় স্যারের পক্ষে ভূমিকা লেখা সম্ভব হয়নি। অন্য একটা কাজে যেদিন স্যারের সাথে দেখা করলাম সেদিন তাঁর কাছ থেকে বইটির ভূমিকা না পেলেও নেতিবাচক মন্তব্য লক্ষ্য করলাম। স্যার কোনো ধরণের রাখঢাক না করে সরাসরি বইটি প্রকাশে নিরুৎসাহিতই করলেন। অনেকটা ভগ্নমনে পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। মন খারাপ হলেও আমি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বরাবরের মতোই নারাজ ছিলাম। পাণ্ডুলিপিটি এবার নিজে উল্টে পাল্টে দেখতে শুরু করি। পুরো রাত এটা নিয়ে কাজ করার পর আমার সংকল্প আরো অবিচল হলো। সিদ্ধান্ত নিলাম এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪ এ ‘গুপ্তগোষ্ঠী ফ্রিম্যাসনারি’র কথা’ শীর্ষক গ্রন্থটি প্রকাশ হবেই ইনশাআল্লাহ।
এগারোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে এই গ্রন্থে পাঠককে ফ্রিম্যাসনদের সাথে পরিচিত করাতে চেষ্টা করেছি। প্রথম অধ্যায়ের আলোচনা আবর্তিত হয়েছে কিংবদন্তীর ফ্রিম্যাসনদের নানা কথা আর তাদের পরিচিতিমূলক বক্তব্যে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে কিংবদন্তীর হিরাম আবিফ ও তাঁর আত্মত্যাগের ঘটনার সাথে আরো অনেক ঘটনার ঘনঘটায় সংঘটিত ফ্রিম্যাসন কৃত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে এসে ইতিহাসের পরিক্রমায় ফ্রিম্যাসনদের আত্মপ্রকাশ ও বিস্তৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে জিওনিজম তথা কট্টরপন্থি ইহুদিবাদের সাথে ফ্রিম্যাসনারির নানা সম্পর্ক নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এরপর পঞ্চম অধ্যায় বিন্যস্ত হয়েছে ফিম্যাসনারি সদস্যপদ লাভের নানা পদ্ধতি নিয়ে যেখানে ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলা হয়েছে ফ্রিম্যাসন নারীদের কথা। সপ্তম অধ্যায় বিভিন্ন ম্যাসনিক লজ ও তার কার্যাবলী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দিতে চেষ্টা করেছে। অষ্টম অধ্যায়ে ফ্রিম্যাসনদের সাথে সম্পর্কিত নানা প্রতীক ও কৃত্যাদির বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আধুনিক ইউরোপের ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও প্রতিসংস্কার আন্দোলন পুরো বিশ্বের ইতিহাসকে অন্যরকম এক মাত্রা দান করেছিলো। গ্রন্থটির নবম অধ্যায়ে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও প্রতিসংস্কার আন্দোলনের সময় ফ্রি-ম্যাসনারিচক্র কিভাবে তাদের অবস্থান রক্ষা করেছিলো তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দশম অধ্যায়ে এসে ফ্রিম্যাসনারির রাজনৈতিক আবর্তন আলোচনা করে একাদশ অধ্যায়ে এর চূড়ান্ত বিস্তৃতি ও এন্টিম্যাসনারী আন্দোলনের বিবরণ দিয়ে বর্ণনায় ইতি টানা হয়েছে।
তথ্যগত নানা সীমাবদ্ধতায় অনেক বিষয় স্পষ্টভাবে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি আক্রমণাত্মক মনে হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইতিহাসের মূল সত্যের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তার পরেও তথ্যগত ত্র“টি কিংবা আলোচনা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে আগ্রহী পাঠক ইন্টারনেট থেকে বিস্তৃত সহায়তা পাবেন। ইংরেজি ভাষায় শুধু ফ্রিম্যাসনারি শব্দটি লিখে গুগলে সার্চ করলেও অনেক তথ্য আসে। সেক্ষেত্রে যাঁরা বেশি জানতে আগ্রহী তাঁদের উচিত এই ছোট্ট কলেবরের গ্রন্থের প্রতি দৃষ্টি সীমাবদ্ধ না রাখা। অন্যদিকে আলোচক সমালোচকদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেষ করতে চাই তা হচ্ছে ‘গুপ্তগোষ্ঠী ফ্রিম্যাসনারির কথা’ গ্রন্থটি কোনো গবেষণামূলক গ্রন্থ নয়, এটি আগ্রহী পাঠকের আগ্রহকে আরেকটু উস্কে দিতে প্রিয় মাতৃভাষায় ঐ সম্পর্কিত প্রথম পাঠ। এই পাঠে যদি কারো আগ্রহ জন্মায় তিনি উপযুক্ত শিরোনাম ধরে ধরে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিতে পারেন।
প্রিয় মাতৃভাষা বাংলায় এই ধরণের একটি নতুন ধারার গ্রন্থ রচনায় সফল হতে পেরে সবার আগের মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। গ্রন্থটি রচনা করতে গিয়ে অনেকের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্তগত নানা পরামর্শ ও উৎসাহ লাভ করেছি যাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। প্রায় প্রতিটি বার আম্মার সাথে ফোনে কথা বললে প্রথম প্রশ্ন থাকতো এবারের বইমেলায় নতুন কোনো বই আসছে তোর, নাকি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছিস। সত্যিই আব্বার অকাল প্রয়াণের শোকটাকে অনুপ্রেরণায় পরিণত করে কাজের উৎসাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়ায় আম্মা তোমার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞ আজ। পড়ার টেবিলে কিংবা কম্পিউটারে যতোক্ষণ কাজ করি প্রতিটি সময় সেদিকে দৃষ্টি থাকে পরম শ্রদ্ধেয় বড় চাচা, প্রিয় বড় ভাইয়া ও ভাবীর। প্রকৃতিতে রাত্রি কখন ভোর হয় সেটা আমার গোচরেই আসতো না যদি আপনাদের চিৎকার আর রাগারাগি শুনতে পেতাম। তাই এই তিনজনকে কৃতজ্ঞতা কিভাবে জানাবো সেটা আমার জানা নেই। আমার ছোট দুই ভাই দীপন ও আবীরের সাথে সাথে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় ইমু চাচা, শারমিন খালা, রিফাত হাসান ভাই, আশরাফ শিশির ভাই, লতিফুল ইসলাম শিবলী ভাই, তানিম ভাই, তিতির আপু, জুন আপু, ত্রিশঙ্কু ভাই, ইয়াসিন ভাই, নাসির, মাহবুব, রাকীব, ইবু, বাপ্পী, ফাহিম, মুফিদ, নাজমুল, নেসার, আব্বাসসহ আরো অনেককে। বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি তাদের মনে এই বিষয়ে আরো নতুন কিছু জানার আগ্রহ জন্মালে আমার দীর্ঘ পরিশ্রম স্বার্থক হবে।

3 thoughts on “গুপ্তগোষ্ঠী ফ্রিম্যাসনারির কথা”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s