যারা ধর্মকে খারিজ করতে চায় আবার ভয়ও পায়


ছুটির দিন। সূর্য ওঠার অনেক পরে বিছায় গিয়ে একটানা ঘুম দিয়ে ওঠায় দুপুর পর্যন্ত  বাইরে দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিলো। একটা মূল্যবান দিনকে আর যাই হোক এভাবে মাটি হতে দেয়া যায়না। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পথ কোনো আলোচনায় অংশ নেয়া। সন্ধার একটু আগে ফোন দিলাম যোবায়ের ভাইয়াকে। ক্লাস শেষ করে উনি তখন জ্যামের মধ্যে ধুঁকছেন। তবুও বরাবরের মত ছোট ভাইদের কোনো কথায় না করার সাহস আজও দেখাননি। ফলে সন্ধার পর যথারীতি গিয়ে হাজির আর তারপর দীর্ঘ আড্ডা।

ভাবছিলাম পুঁজিবাদের এতোগুলো সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ করে উত্থান ঘটলো সমাজতন্ত্রের তবুও মানুষের মুক্তি মিলছে না কেনো। সমাজতন্ত্রের সমাধি রচনার কয়েক দশক হতে চললো। দিনকে দিন সাবঅলটার্নের রক্তনদী বইয়ে সেখানে চলছে পুঁজিবাদের জাহাজ। সবথেকে বড় কথা যারা বামপন্থি আন্দোলন করতো তারাই এখন একে সবথেকে বড় পুঁজিতে পরিণত করেছে। তাদের দৃষ্টিতে বিপ্লব একটা বড় ধরণের ব্রান্ড যা নিয়ে ব্যবসা করে খাওয়ার অধিকার তাদেরই। চে তাদের বাপ দাদার সম্পত্তি সুতরাং তারা চে এর ছাপ মারা ব্যাগ, টুপি, আর্মব্যান্ড, টি-শার্ট চাইকি লিঙ্গারি এবং আন্ডারওয়্যার থেকে শুরু করে মোজা, টয়লেট টিস্যু কিংবা স্যানিটারি ন্যাপকিন বানিয়ে বিকোলেও তাতে বামপন্থার মানহানি হবে না। এসব দুর্ভাবনা অনেকদিন থেকেই কুরে কুরে খাচ্ছে। সবথেকে বড় প্রশ্ন এগুলো নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রো-ইসলামিস্টদের কাছে সোজা নাস্তিক ট্যাগ খাওয়া লাগে। আর বামপন্থার ব্যবসায়ীরা কখনোই চাননা তাদের ব্যবসার মূলধন নিয়ে সাধারণ পুলাপাইন হাতাহাতি করুক।

সত্যি বলতে কি সমাজতন্ত্র তত্ত্ব হিসাবে শুনতে ভালই লাগে কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন কতটুকু তা নিয়ে আমরা আমজনতা তো অবশ্যই এর অন্ধভক্তদেরও প্রচুর সন্দেহ কাজ করে। মুখে যতোই বাকোয়াস করা হোক না কেনো এই তত্ত্ব মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে কিংবা ইনোভেশন ক্যাপাবিলিটিকে উত্সাহিত না করে নিরস্ত করার ভাবনায় রত।পাশাপাশি এরা ধর্মকে একাধারে খারিজ করতে চায়, পাশাপাশি ভয়ও পায়।  একটু খেয়াল করে দেখুন ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলাকালীন ভোদকাখোরগুলো যে কারণে টিকতে পারেনি তার মূলেই প্রোথিত রয়েছে মার্ক্সের চিন্তার দুর্বলতাগুলো। মার্ক্স বেচারা তাঁর নাচাকুঁদা সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন শুধু পুঁজিতেই। সমাজ কিংবা জীবন ভাবনার মত কাজে ব্যায় করার মত সময় তার হয়নি। পরে তার চেলারা ইচ্ছেখুশি মত সেগুলোকে বানিয়েছে এবং যথেচ্ছা ব্যবহার করেছে। এতে করে অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে মতবাদটি নির্দিষ্ট সময় পরে পুরাতন খবরের কাগজের মত ছুঁড়ে ফেলতে হয়েছে।

কেউ কেউ চীনের উন্নতির কথা বলতে পারেন তবে আমি কখনোই সেটা স্বীকার করবো না। বিশেষ করে আজ তাদের যেটুকু উন্নতি তা শুধুমাত্র বাজার ব্যবস্থার সাথে অভিযোজিত হওযার জন্য।  যোবায়ের ভাই কিংবা রাসেল ভাউ উনারা একমত হলেন কিছু বিষয়ে। পাশাপাশি যোবায়ের ভাই একটা ক্ষেত্রকে আরো স্পষ্ট করে দিলেন। সেটা আমাদের চিন্তার গভীরতা না থাকা। আর মার্ক্সের চিন্তাগুলোর ভুল বাংলা অনুবাদ পড়ার পাশাপাশি সেগুলোকে যথেচ্ছা ব্যবহারেও দিনকে দিন আবেদন হারাচ্ছে সেটি। ফলে একটা সময় এসে দেখা গেছে ধর্মকে ভয় পাচ্ছে ধার্মিকরা। তারা সমাজ পরিচালিত করতে চাচ্ছে তাদের মতো করে। এদিকে মৃতপ্রায় বামপন্থার ধারক ও বাহকরা সেকুলারপন্থার ধ্বজা ধরে চড়াও হচ্ছে জনগণের উপর। কিছুদিন পর তারা আরো পচে যাচ্ছে। আর তাদের পরাজয় আরো বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলছে ধর্মানুভূতিতে আস্থা রাখা মানুষগুলোকে। ফলে মুখে লিবারেলিজমের ধুয়ো তুললেও দুটো ধারা উগ্রপন্থা গ্রাস করে নিচ্ছে সমাজকে।

যোবায়ের ভাইয়ের যুক্তির সাথে আমি যোগ করতে চাই এবারের রমজান মাসের কথা। অনেক গায়ের জোরে সেকুলার সেজে বসা মাদ্রাসার হুজুর কিংবা জামাতী বাপের সন্তানও রোজার মধ্যে ঢাকায় বসে একজন রোজাদারের সামনে ভাব নিয়ে সিগ্রেট ফুঁকেছে। তাদের কথা হলো তুই বেটা ধর্ম মানবি, তুই ব্যাকডেটেড এবং সমাজচ্যুত। পক্ষান্তরে গ্রামের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে দেখা গেছে অনেক ভদ্র নম্র হিন্দু ঘরের সন্তান একজন রোজাদারকে সম্মান দিতে গিয়ে খাওয়ার সময় আড়ালে গেছে। অন্তত তার সম্মানে সিগারেট ফুঁকেনি।  একটু চিন্তা করুণ পাঠক, কোন বিশেষ কারণে দেশে উগ্রপন্থা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এখানে আমাদের সবথেকে বড় দুর্বলতা হচ্ছে মুদ্রার দুটি পিঠ না দেখা। ফলে আমরা ইচ্ছেমত ডিসকোর্স হাজির করি। রাশিয়ানদের সেখানো মুখস্থ বুলি আওড়ে জোর করে জনগণকে গেলাই, তারপরা তারা সেসব জ্ঞান আমাদের মুখের উপরেই বমি করে দেয়, তবুও সে বামপন্থায় আমরা খুশি।

পোশাকের উগ্রপন্থার দিকে নজর দেয়া যাক। আমি মেয়েদের প্রতি সম্মান রেখে দু’ ধরণের পোশাকের ক্রিটিক করতে চাই। আমাদের আপুরা প্রথমে কি দেখে আক্রমণাত্মক হয়ে ভাবলেন কাপড়ের খরচ কমাতে হবে। ব্যস শুরু হয়ে গেলো গিরার উপরে যতদূর সম্ভব তুলে চামড়া খিচে ধরা টাইটি টাইপ জেঙ্গিস। কিছুদিন আধুনিকাদের ব্রান্ডে পরিণত হওয়া এই পোশাকের বাজারে টান পড়লো। পুঁজিবাদীরা ভাবলো ধুরো এতো কম কাপড় পরলে তো আমাদেরই লোকসান। সুতরাং বুদ্ধি বদলাও, ব্যস চলে এলো প্যালাজ্জো। দূর থেকে দেখলে জেঙ্গিসকে যেমন মনে হয় পোশাকবিহীন তেমনি এই প্যালাজ্জো আর লুঙ্গির মধ্যে শুধু পার্থক্য একটা সেলাইয়ের। ফলে বরাবরের মত উপকৃত হলো রাস্তার মোড়ের বখাটে গুলোই।  আর এর মূল কারণ ঐ পোশাকি মৌলবাদ কিংবা উগ্রপন্থাই। যে উগ্রপন্থা একজন গ্রাম্য নারীকে শুধু মাথার কাপড় কাধে নামার জন্য বেত্রাঘাতের মুখোমুখি করেছিলো। আমি বলবো সেকুলারদের ততোধিক উগ্রপন্থা জোর করে নারীদের বস্ত্রহরণ করছে। কখনো হাফ কিংবা মিনি-স্কার্ট, কখনো জেঙ্গিস কিংবা প্যালাজ্জো। উদ্দেশ্য একটা শরীকে এজমালি মূলধনে পরিণত করা।

পুঁজি সাথে সামাজিক সংস্কার ও সংস্কৃতির সংঘাতটা এখানেই। পুঁজিবাদ বিরোধী বামপন্থা শুধু হাউ-মাউ-খাউ করে বিপ্লবের কথাই বলেছে। কিন্তু ফরাসি বিপ্লবের মতো একটা বিস্তৃত পরিসরের ঘটনা কিভাবে মুখ থুবড়ে পড়লো, জন্মনিলো রোবেসপিয়েরের সন্ত্রাসবাদ। কিংবা লিবারেলিজম চর্চা থেকে সরে গিয়ে আরব ভূখণ্ডে জন্ম নিলো বর্বর রাজতন্ত্র সেগুলোর ব্যাখ্যাদানের মত সাহসী আদম সন্তানের জন্য বামপন্থা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে এখনো জায়েজ হয়নি। আমি বলবো সভ্যতার সংকটটা ঠিক ওখানেই।

এ সংকট কাটানোর জন্য আর কিছু না চিন্তা করতে হবে নিজের অবস্থান থেকে। বাংলাদেশকে দেখতে বাংলাদেশের মতো করে। তবে তার মানে এই না জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে ফ্যাসিবাদ জন্মনেয়। প্রথমে অধিকার সচেতন হতে হবে কিন্তু তারমানে এই নয় সে অধিকার অন্যের উপর অনধিকার চর্চা করবে।  পুঁজিবাদ যেমন দমনমূলক ও আগ্রাসী তেমনি জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া লেনিনীয় উগ্র বামপন্থা  ফ্যাসিবাদেই অপর প্রান্ত দেখিয়ে দেয়। ধর্ম ব্যবসায়ীদের দমন করতে গিয়ে ধার্মিক মানুষগুলোকে কটাক্ষ করার নোংরামি করাটাকেও তাই দেনেখতে চাই সেকুলার ফ্যাসিবাদ হিসেবে। সব ধরণের ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হয়ে আসুন সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ চর্চা করি। ভিন্ন মতকে মানতে না পারি অন্তত শুনতে দোষ নাই। আর সেক্ষেত্রে জোর করে সেকুলার কিংবা ধার্মিক বানানোর অধিকার আমার কিংবা আপনার কারো নেই। সুতরাং আমি তাদের কাছ থেকে সংঘাতের শাপমুক্তির কোনো আশা দেখছি না, যারা ধর্মকে খারিজ করতে চায় আবার ভয়ও পায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s