‘ইলেভেন মিনিটস’


images

যে যাই মনে করুক আমি শুরুতেই বলব। ব্যর্থ প্রেম-ভ্রষ্টাচারে বিষাক্ত এক জীবনের গল্প ‘ইলেভেন মিনিটস’। শুরুটা স্কুল থেকে। নির্জন রাস্তায় মারিয়ার স্কুল যাওয়া; সেই ছেলেটি। নীরবে এক পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে একদিন তার এগিয়ে আসা, একটা পেন্সিল চাওয়ার অজুহাতে মারিয়াকে কিছু বলার চেষ্টা; তার পর ব্যর্থতায় তার বদলে যাওয়া। আর দশটা স্বাভাবিক মেয়ের মতো বয়ঃসন্ধিকালের অনুসন্ধিত্সু সময় পার করতে গিয়ে মনোদৈহিক বদলের মুখে মারিয়া কী করেছে, সেখান থেকেই বর্ণনার শুরু। নানা কষাঘাতে বারবার বদলে গেছে তার জীবনের গতিপথ। এর পর হঠাত্ রিও ডি জেনিরো গমন; সেখানে একই সাথে নিরাপত্তারক্ষী-দোভাষী-সুইস এজেন্টের দালাল ম্যালিসনের সাথে পরিচয়। একজন মডেল হওয়ার তীব্র বাসনা আর ঝলমলে পর্দার হাতছানি তাকে সাহস দেয়। বাড়িতে ফিরে মা-বাবার অনুমতি নিয়ে সে পাড়ি দেয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভা। এমন একটা দেশ যেখানে তার পরিচিত কেউ নেই, নেই স্বজন এমনকি তার ভাষা বোঝে, এমন মানুষ মেলা ভার।

ফ্যাশান ইন্ডাস্ট্রির একজন মডেল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে জেনেভায় পা রাখার পর মারিয়ার ঠাঁই মেলে একটা সাদামাটা বোর্ডিং হাউজে। একজন ব্রাজিলীয় সাম্বা ড্যান্সার পদবিতে বারে চাকরি পাওয়া মারিয়া এখানে আসার আগে যে ঝলমলে স্বপ্ন দেখেছিল, তা মুহূর্তে উবে যায়, রঙিন আলোর নিচে সপ্তাহের সাতটি দিন নাচতে নাচতে তার কোমর ধরে আসে। সারাটি দিন কেটে যায় হ্যাংওভার কাটাতে আর সারা রাতের অমানুষিক শ্রমের ধাক্কা সামলে নিতে। তাই চারদিকে এত আলো থাকার পরও কাটেনি তার মনের আঁধার। পাওলো কোয়েলহো বর্ণনার একটি পর্যায়ে বলেছেন, ব্রাজিলের প্রায় প্রতিটি মেয়ে মায়ের কাছে প্রথম বুলি আর সাম্বার ছন্দ একই সাথে শেখে, যার ব্যতিক্রম ছিল না মারিয়াও। নিতান্ত শখের বশে উত্সব আয়োজনে সেগুলো করতে হয়েছে তাকে। এখন সেই শখের কাজটিই তার রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন, তাও কোনো ছুটি নেই; চলে লাগাতার সাতটি দিন।

কায়িক শ্রমের ধকলটা সে বেশ কষ্টে সামলে নিতে পারে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ, সবকিছুর পরও মুখে স্টিকারের মতো লাগিয়ে রাখতে হয় একটা কিম্ভূতকিমাকার হাসি। মানুষ প্রাণোচ্ছল মুহূর্তগুলোয় তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে যে হাসিতে, তা যদি জোর করে ব্যবসার মূলধনে পরিণত হয়, তা হাসি থাকে না, পণ্য হয়ে যায়। আর ভারবাহী গাধাগুলো কিংবা পাঁচ টনি ট্রাক যেমন পণ্য বহনের সময় ক্লান্ত-নাকাল হয়ে যায়, তেমনই অবস্থা মারিয়ার। তবু সে চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসে, ভালোবাসাও তার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। প্রতিপদে প্রতারিত হতে থাকা মারিয়ার জীবনে যে কয়বার ভালোবাসা এসেছে, কোয়েলহোর বর্ণনায় সেগুলো নিছক ভালোবাসা কিংবা প্রতারণার আলেখ্য থাকেনি, হয়ে গেছে জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা তথঃবৈচ ‘স্টোরি অব আ রোমান্টিক অ্যাডভেঞ্চার ইন সোবার অ্যান্ড এক্সট্রাভ্যাগেন্ট পোশ্চার’। রাতের অসম্ভব খাটুনি মারিয়াকে দমাতে পারেনি, সে বাঁচতে চেয়েছে নিজের মতো করে। তাই নতুন উদ্যমে তার ফরাসি ভাষা শিখতে যাওয়া; এক আরব যুবকের প্রেমে পড়ে বারড্যান্সারের চাকরি থেকে দু’ সপ্তাহের জন্য বহিষ্কারের অভিজ্ঞতা তার জীবনের নতুন মোড় এনে দেয়।

শাস্তিস্বরূপ ড্যান্সারের চাকরি থেকে বহিষ্কার মারিয়াকে চলমান যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি এনে দেয়। সে চেষ্টা করে কিছু প্রফেশনাল ফটোশ্যুটের; পরিচয় হয় স্থানীয় এক বিখ্যাত ফটোগ্রাফারের সাথে। বিভিন্ন এজেন্সিকে সে ছবি পাঠানোর পাশাপাশি নিজের মা-বাবাকেও পাঠায় কিছু স্থিরচিত্রালেখ্য; যা তার যন্ত্রণায় ভরা মুখচ্ছবি সাময়িক হলেও হারিয়ে গিয়ে হাসি ফোটাতে পারে মায়ের মুখে। অন্তত যে মা তাকে অনেক সমস্যার মধ্যেও নানা ঝুঁকি উপেক্ষা করে ঠেলে দিয়েছিল অনিশ্চিত এক অভিযাত্রিকে। এভাবে বদলে যাওয়া জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে কোয়েলহোর সাবলীল বর্ণনায় নতুন করে ভাষা পায় অন্য রকম ভালোবাসা ‘Love is not to be found in someone else, but in ourselves; we simply awaken it. But in order to do that, we need the other person. The universe only makes sense when we have someone to share our feelings with.’ আর তা-ই নয়, পুরো বইটি পড়ে শেষ করলে পাঠক পাবেন অন্য রকম এক জীবনের প্রতিচ্ছবি। আবেগ, অনুভূতি, প্রতারণা, ধিক্কার, ক্লেদাক্ত হটকারিতা, ভালোবাসা, শরীরী মোহ, পাশবিক কামপ্রবৃত্তি, স্যাডিজম, ভালগার ফেটিশিজম আর শেষে গিয়ে পুরোটাই জীবনের গল্প। আর ব্রাজিলের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় রূপায়িত এ আলেখ্যর পরিণতি তাই অনেকটা যুবা তা তদূর্ধ্ব।

আগে পাওলো কোয়েলহোর লেখা পড়ে পাঠক যে ধারণা অর্জন করেছিলেন, ইলেভেন মিনিটস তার থেকে পুরো বদলে যাওয়া এক ঘটনা। আর এজন্য ক্ষমাপ্রার্থী লেখক স্বয়ং; কারণ এটা তেমনই এক উপন্যাস, যেখানে অনেক কঠোর, বিপত্তিকর ও বেদনাদায়ক ইতিবৃত্ত ঠাঁই পেয়েছে বর্ণনার ধারাক্রমে। পাশাপাশি সব বর্ণনার আড়ালে মানব পাচারের যে আন্তর্জাতিক চক্র তাদের চরিত্র সম্পর্কেও কিছুটা জানা যায়। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মারিয়ার জীবন অন্তত তা-ই বলে। রিও ডি জেনিরো থেকে একজন বিশ্বখ্যাত নর্তকী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর মারিয়া জেনেভা এসে শেষ পরিণতি পায় অখ্যাত বারবণিতার জীবনে। আর উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা ঠিক সেখানেই। এক সময়ে এসে জেনেভার সেক্স ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা মারিয়ার এগারো মিনিটের বিনিময় হয় ১ হাজার সুইস ফ্রাঁ। সে জীবনসংগ্রামে পরাজিত, নাকি জয়ী, এটা বলার আগে লেখক মাত্র এক বছরেই অবসরে পাঠিয়েছেন মারিয়াকে; যখন সে অনেক ধনী এবং প্রতিষ্ঠিত। সব মিলিয়ে ইলেভেন মিনিটস কোনো সর্বভুক পাঠকের জন্য উপাদেয় উপন্যাস নয়। এর বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও বিভ্রান্তির; তাই পড়ার ক্ষেত্রে সাবধানী হওয়াটাই শ্রেয়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s