কতটা সময় ইতিহাসে হাজার বছর হয়?


suvo noboborsho_26241শ্রদ্ধেয় গোলাম মুরশিদ স্যার একখান কেতাব লিখেছেন। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। আশার ছলনে ভুলি শীর্ষক মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনীগ্রন্থ পাঠ করার পর স্যারকে আমার ক্ষুদ্র চিন্তাজগতের অনেক উপরে স্থান দিয়েছিলাম। তবে এই হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি বইটি পড়ার পর চিন্তা হয়েছে বার বার বাঙালির ইতিহাস কিভাবে হাজার বছরের। প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী ও গবেষক হিসেবে শুরু থেকেই এই কালানুক্রমিক বিভ্রাট নিয়ে অনেক তর্ক হাজির করার পক্ষপাতী ছিলাম। তবে হাজার বছরের এ প্রশ্নটি বহুবার লোকমুখে বহুল উচ্চারিত। ঠিক যেমনি একটা সময়ে বলা হত রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছরের ভয়াল উপাখ্যান। আমার পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক একেএম শাহনাওয়াজ স্যারের গবেষণায় একটা পর্যায়ে দেখা গেল রাজধানী ঢাকার বয়স ৪০০ বছর তো নয়ই বরং দ্বিগুণের বেশি। ইকলিম মুবারকাবাদ থেকে স্যার হিসেব করেছিলেন, পক্ষান্তরে আমি একটা প্রবন্ধই লিখে বসলাম ‘দোলাই বুড়িগঙ্গা তীরে হাজার বছরের ঢাকা’, যেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

সম্প্রতি পহেলা বৈশাখ সমাগত, শুরু হয়েছে ঐ এক মুখস্থ বয়ান, যেটা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে। এক্ষেত্রে গোলাম মুরশিদ স্যারের সর্বশেষ গবেষণাগ্রন্থ ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ থেকেই অবাস্তবতার শেকড়টা খুঁজে ফিরতে হয়। জাতীয়তাবাদী জোশে উদ্বুদ্ধ বাঙালি পাঠকের কেউ কেউ এটাকে অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ বলে মনে করেন, তবে আমার মনে হয়েছে একজন গবেষক হিসেবে স্যারের এই বইটি নানা দিক থেকে প্রশ্নের দাবি রাখে। ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্বের গবেষক হিসেবে আমাদের পক্ষে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি বাক্যবন্ধটি মেনে নেয়া কষ্টকর হলেও অগ্রহণযোগ্য নয় মোটেও। বিশেষ করে এর স্বপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ লাগবে যেটা মুরশিদ স্যারের এই বইতে অনুপস্থিত। আদতে মুরশিদ স্যার সাধারণ পাঠকদের কান ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছেন একটা জায়গায় যেখানে আমাদের জাতি-ইতিহাসের সূত্রপাত দাবি করা হচ্ছে হাজার বছর মাত্র। কিন্তু বাংলাদেশের প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির তেমন কোনো বর্ণনা এই বইয়ে নেই বললেই চলে। তিনি সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে গেছেন মধ্যযুগে বাংলার সোনালি সময় স্বাধীন সুলতানী আমলের নানা আখ্যান।

এডওয়ার্ড বার্নেট টেইলরের সেই বস্তাপচা সঙ্গায় সস্তা বর্ণনা, যেখানে অগ্রাহ্য করা হয়েছে লুই বিনফোর্ড, ইয়ান হডার তো বটেই ব্রনিস্লো ম্যালিনোস্কিরও ঠাঁই মেলেনি সেখানে। তাঁর বর্ণনায় মানুষের বিশ্বাস, আচার-আচরণ এবং জ্ঞানের কিয়দংশই সংস্কৃতি। এখানে ভাষা, সাহিত্য, ধারণা, ধর্ম ও বিশ্বাস; রীতিনীতির সঙ্গে পালিত উৎসব-পার্বণ আর শিল্পকর্ম মিলিয়েই দায়সারা বর্ণনার শেষ। কিন্তু সংস্কৃতি যে অভিযোজনের দেহাতিরিক্ত মাধ্যম সেটা অস্বীকার করলে প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতিটাই বাদ পড়ে। অন্যদিকে মানুষের যাযাবর জীবন কিংবা উন্নয়নের সরলরৈখিক বর্ণনাক্রমে প্রস্ফুটিত সাফল্য অভিজ্ঞানও অনুপস্থিত হয়ে পড়ে ক্ষেত্রবিশেষে। তাই এ চৌদ্দ অধ্যায়ে বিভক্ত বইটি আমাদের মতাদর্শিক বিভক্তির বাইরে আর তেমন কিছু দিতে পারলেও আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে তা ধরা পড়েনি।

একটু ধীর লয়ে এর পর্যালোচনার চেষ্টা করা যাক। জাতি হিসেবে বাঙালির উত্থানপর্বের যে বর্ণনা সেখানে রেসিয়াল ফ্যাক্টর স্পষ্ট। তিনি আধুনিক বাঙালি হওয়ার গল্পটা শুনিয়েছেন বেশ নিজের মত করে। সেখানে ইন্দো-মুসলিম আমলে সংস্কৃতির রূপান্তর; খ) বাংলার সমাজ ও ধর্ম পর্যন্ত যে বর্ণনা সেখানে আমার মনে হয়েছে নাই নাই ভাবটা খুব বেশি। অন্যদিকে পশ্চিমের অভিঘাতে বাঙালি সংস্কৃতির যে কালপর্ব সেখানে শুরু আছে শেষ হতেই চায় না। এদিকে বিশ শতকের বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে যে পঞ্চম অধ্যায় সেখানে ঐ একই দশা। সবমিলিয়ে তিনি ৬-১৪ অধ্যায় পর্যন্ত প্রণয়, পরিণয়, পরিবার; বাঙালি নারী ও বাঙালি সংস্কৃতি; বাংলা ভাষা ও সাহিত্য; বাংলা গানের ইতিহাস; নাটক ও সিনেমা; স্থাপত্য চিত্রকলা কারুকলা; বাঙালির পোশাক; বাঙালির খাবার কিংবা বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালির বৈশিষ্ট্য শিরোনামে যা বলতে চেয়েছেন সেখানে হাজার বছরের তুলনায় উত্তর-ঔপনিবেশিক ছাপই স্পষ্ট বটে।

হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি নাম নেয়া এই বইটি আমার বিচারে জাতি হিসেবে বাঙালির পরিচয়ে একটি উত্তম রচনা। তবে সংস্কৃতিকে ফোকাস পয়েন্টে রাখলে এর বর্ণনানুক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। অন্তত শুরু থেকে শেষ তিনি যা ইচ্ছে বলে গেছেন সেখানে সাংস্কৃতিক অনুক্রম কোনও দিক থেকেই সুস্পষ্ট নয়। হিন্দু ও মুসলিম এই দুটি প্রধান ধর্ম সামনে রেখে যে যুগবিভাজন তার পরবর্তীকাল খ্রিস্টান কিংবা ঔপনিবেশিক যুগ কেনো হলোনা তার কোনো বিতর্ক এখানে নেই। আর ধর্মের ভিত্তিতে ইতিহাসকে যদি ভাগ করাই হয় সেখান থেকে বৌদ্ধরা কিভাবে গায়েব তার সদুত্তর নেই এখানে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি মুরশিদ স্যারের এই বই আর কিছু না করুক আমাদের বদভ্যাসটা করে দিয়েছে বেশ। যাই হোক এটাও স্যারের স্বার্থকতা। যদিও প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা স্যার মর্টিমার হুইলারের Five Thousand Years of Pakistan: An Archaeological Outline পড়েছি। সেক্ষেত্রে তার থেকে একটু আধটু যোগ কিংবা কাটছাঁট করে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি কিংবা ৪০০ বছরের ঢাকা বলার তাড়না বোধ করিনি। আর এখানেই উদযাপনের সংকটটা বোধকরি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে।

আজ প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রোনিক মিডিয়াতে বেশ ঘটা করে পহেলা বৈশাখকেও বলা হচ্ছে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায় মোগল সম্রাট আকবরের নির্দেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। একটু খেয়াল করলে দেখা যায় এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকেই। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। ইতিহাসের অভিঘাত যাই হোক একটু হিসেব করলে দেখা যায় বাংলা সনের জন্মকথাই যেখানে হাজার বছরের নয়। সেখানে বাংলা নববর্ষ কিভাবে হাজার বছরের সংস্কৃতিজ্ঞাপক হয়? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দায়টা বোধকরি তাদের যারা ফেনিল বদনে বলছেন হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ। আর এক্ষেত্রে আমার যুক্তিতর্কের ভিত্তিটা সময় নিয়েই। কবির সুমনের জনপ্রিয় গান ‘কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়’ ধরেই একটা সহজ প্রশ্ন, কতটা সময়ের ইতিহাস হাজার বছর হয়?

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s