জেরুজালেম গ্রন্থের মুখবন্ধ


স্মৃতি ইতিহাস হয়, অপ্রাপ্তিগুলো অতৃপ্ত মনে ভাষার মায়াবী আখর টানে; দেয় কাব্যের জাল বুনে যাওয়ার নিরলস অভিপ্রায়। অনেক ঘটনার ঘনঘটায় কিছু ঘটনা থেকে যায় এ ঘাট থেকে বেশ দূরে। এগুলো হৃদয়ে ধরে আবেগশূন্যতায় ভোগে মানুষ; কল্পবিলাসী প্রতারক মন তবুও বার বার কাঁদায় তাকে। জেরুজালেম এমন এক নগরী যার স্মৃতি রোমন্থনে এ কান্না সবার অতীত নিয়ে, ঐতিহ্যের শেকড় আর জাতিগত পরিচয়ের সংকট সামনে রেখে। হিব্রু থেকে ইহুদি জাতি বিকাশে আপন ভূখণ্ডের দাবি, স্মৃতিময় আল আকসা আর রাসূল সা. এর মিরাজ গমন হৃদয়ের মণিকোঠায় ধরা মুসলিম জনগোষ্ঠী, মহান যীশুর উত্থান ও তিরোধানে ঋদ্ধ পীঠস্থানের আবেগ আপ্লুত খ্রিস্টান কেউ এর বাইরে নয়। ইতিহাস কিংবা ধর্মকথন সবই বলছে প্রত্যেকের শেকড় রোমাঞ্চক এ রহস্যনগরী জেরুজালেমের গহিনে প্রোথিত। তাই ইতিহাস, সাহিত্য, প্রত্নচর্চা কিংবা চলচিত্র নির্মাণের চেষ্টা কোনো ক্ষেত্রেই কর্ম আর মোক্ষ নিজ গতিতে বেগবান হতে পারেনি। এখানে নিজ জাতির শেকড় টেনে
জেরুজালেমের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিটাই মূখ্য হয়ে গেছে সবার কাছে। মন্টেফিউরি থেকে কাসলার, কোহেলহো থেকে আসিমভ, বেনিয়ামিন থেকে লিংকন, হযরত ওমর রা. থেকে ক্রুসেড বিজয়ী সালাহউদ্দিন আইয়ুব প্রত্যেকের কাছে এ নগরীর নিয়ন্ত্রণ হয়ে গেছে সব কথার শেষ কথা। ইতিহাস লেখক কিংবা প্রত্নর্চাকারীর মৌলিক গুণাবলী, ইতিহাসের প্রকৃতি কিংবা অতীত চর্চার নীতিকথা বেশ ভালো করেই জানেন সবাই। কিন্তু জেরুজালেম এমন এক নগরী যার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এ নিয়ম শিকেয় তুলে সবাই চান নিজের ধর্ম, স্ব স্ব চিন্তা আর শেকড় থেকে যুক্ত আদর্শকে টেনে সামনে নিয়ে আসতে। একজন ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্বের গবেষক হিসেবে তাই আমার মনে হয়েছে বাজারে-অনলাইনে ‘জেরুজালেমের ইতিহাস’ বলতে যা লভ্য তার একটাও জেরুজালেমের অতীত তুলে ধরেনি বরং লেখক মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কিছু অতৃপ্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

একজন ইহুদি ইতিহাসবিদ যখন জেরুজালেম নিয়ে কিছু কথা লিখেছেন বা লিখতে চেয়েছেন সেটা শেষ পর্যন্ত আর ইতিহাস না থেকে হয়ে গেছে ইহুদি বসতি নির্মাণের নানা আদিকথার এক সংকলন। একজন খ্রিস্টান ইতিহাসবিদের চোখে জেরুজালেম যীশু মেরীর পূণ্যস্মৃতিঘেরা এক মায়াবী পীঠস্থান। অন্যদিকে মুসলিম ইতিহাসবিদের চোখে জেরুজালেম মানে এক সাগর কান্না, ক্রুসেডের গণহত্যায় রক্তস্নাত শিহরনে ঈমাণ আপ্লুত করার ইতিকথা। আর এটাই যদি বাস্তবতা হয় তবে রহস্যনগরী জেরুজালেমের ইতিহাসটা কে লিখবেন, কিভাবে বের হয়ে আসবে এর বাস্তবতা? সত্যি বলতে ঐতিহ্যনগরী জেরুজালেমের মালিকানা নিশ্চিত করতে গিয়ে মৌলবাদী ইহুদি রাষ্ট্র ইজরাইল কিংবা তখনকার প্যাগানবাদী অ্যালিয়া ক্যাপিটালিনার উপাসকদের কোনো পার্থক্য নেই। এখানে তারা কেউই অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তায় বিশ্বাস করে না। অন্যদিকে ক্রুসেডের রক্ত দিয়ে পরিশ্রুত ইতিহাসে মুসলিম সম্প্রদায় কখনোই তাদের জেরুজালেমে ইহুদিদের স্বীকার করতে চাইবে না। আর খ্রিস্টানরা ইহুদিদের উপস্থিতি অতিকষ্টে মানলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে মুসলিম অধিকার প্রশ্নে নীরব থেকে গেছে সবাই।
অনেক পরিচয় ছাপিয়ে জেরুজালেম বিশ্বের প্রাচীনতম শহর যেখানে মানুষের বসবাসে কোনো সময়গত শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি। অর্থাৎ মানব বসতি স্থাপনের পরম্পরায় এখানে কোনো ধরণের ছেদ পড়েনি। সৃষ্টির আদিকাল থেকে বিচার করতে গেলে বিচিত্র এর ইতিহাস, তার চেয়েও বিস্ময়কর ও বৈচিত্র্যময় একে ঘিরে গড়ে ওঠা উপখ্যানগুলো। ইহুদি, খ্রিস্টান ও পরবর্তীকালে মুসলিম ধর্মের আবির্ভাবে বার বার বদলে গেছে এ শহরের গতি প্রকৃতি। তবে অনন্যসাধারণ প্রাণশক্তি নিয়ে অনাদিকাল থেকে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়ে গেছে রহস্যনগরী জেরুজালেম। সবাই এ শহরকে নিজের বলে দাবি করে, এর ঐতিহ্য, এর উপাখ্যান আর রহস্যের জাল ছেদ করে একান্ত আপন ভাবতে ভালোবাসে প্রত্যেকেই। তবে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর এত আগ্রহ, এমনি টানাপোড়েনে আরো বিস্মৃত  আর ধোঁয়াটে হয়ে গেছে এ নগরীর ইতিহাস।
ইতিহাসের আলোচনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ব্যাখ্যা কিংবা আর যেদিকেই দৃষ্টি দেয়া হোক না কোনো জেরুজালেম এক বিতর্কের নামান্তর। রোমাঞ্চক এ নগরী প্রতিটি উপাখ্যানের আদ্যোপান্ত রচিত হয়েছে বিতর্কিত আবেগ আর অদ্ভুত অনুভূতির শিহরণ জাগিয়ে। তবে তিন তিনটি ইব্রাহিমী ধর্ম তথা আহলে কিতাবের ধর্ম আবর্তনের ইতিহাস এ নগরীকে ঘিরে। পবিত্র কুরআনে সূরা বনী ইসরাইল যেমন প্রথম আয়াতেই বায়তুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তেমনি অনেক নবীর পূণ্যস্মৃতি মহিমান্বিত করেছে এ নগরীকে। ইহুদিধর্ম কিংবা খ্রিস্টধর্মের ক্ষেত্রেও এর আবেদন কমেনি কোনো অংশে, বরং একে অন্যকে বাদ দিয়ে নিজের মালিকানা দাবি করতেই এককাঠি সরেস।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো প্রথমে ‘জেরুজালেমের ইতিহাস’ শিরোনামে গ্রন্থ প্রণয়নে হাত দিয়েছিলাম ইতিহাস রচনার নামে সিমন শেবাগ মন্টেফিউরির নীতি বহির্ভুত মিথ্যাচার দেখে। সুন্দর সূচনা সামনে রেখে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিকই; তারপর নীতি বিসর্জন আর ইতিহাস বিপর্যয়। এক পর্যায়ে বাকিদের মত তিনিও অনেকটা নীতি-আদর্শের লুঙ্গিতে মালকোচা মেরে জায়নবাদের পঙ্কিল সরোবরে নেমে গেছেন মৌলবাদী ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ঐতিহাসিক শোল-টাকি-বোয়াল মাছ ধরতে। তাই সময়ের আবর্তে নির্মোহ, বাস্তবসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরার বদলে বিকল্প ধারার চেষ্টাই মূখ্য হয়েছে তাঁর গ্রন্থের দ্বিতীয় অর্ধাংশ ধরে। একজন প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী এবং নতুন প্রজন্মের ইতিহাস পাঠক-গবেষক হিসেবে এটা মেনে নিতে পারিনি বলেই জেরুজালেম নিয়ে প্রচুর পড়েছি গিত বছর তিনেক ধরে। তারপর সাহস করে গ্রন্থ রচনায় হাত দিই। তবে এটা কোনো গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নয় বরং জেরুজালেম নিয়ে আমার চিন্তাগুলোকে ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তিকে দুই মলাটে গ্রন্থিত করার একটা প্রয়াস। অন্যদিকে বাকি সবাই জেরুজালেম নিয়ে দু’কলম লিখে তাকে এ রহস্য নগরীর ইতিহাস দাবি করলেও অন্তত আমি এটাকে ইতিহাস গ্রন্থ বলবো না। স্বভাবতই গ্রন্থের শিরোনাম থেকে ইতিহাস কথাটা ছেঁটে ফেলে শুধু জেরুজালেম রাখা হয়েছে।
সব কৃতজ্ঞতা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি যাঁর দয়া বাদে কর্মজীবনের শুরুতেই সুযোগ বঞ্চিত হয়ে হতাশ ও ফেরারী কারো পক্ষে এত শ্রমসাধ্য একটা কাজ করা সম্ভব হত না। ধন্যবাদ দিতে হয় ডা. একেএম নাজমুল ইসলামকে যিনি চিকিৎসা পেশায় ব্যস্ত সময় পার করার পরেও গত বইমেলা থেকে ‘ব্যাটা মফিজ ভালো কিছু তো করবি না, জেরুজালেমের ইতিহাসটা আগামী বছর শেষ কর’ বলে ঠেলতে শুরু করেছেন। ধন্যবাদ দিব্য প্রকাশের সোহরাব ভাইকে, বার বার তাগিদ দিয়ে বিরক্তির শেষ পর্যায়ে নিয়ে হলেও বইটা শেষ করতে আমাকে বাধ্য করায়। বইয়ের শেষে উপযুক্ত রেফারেন্স সন্নিবিষ্ট হয়েছে যা থেকে আগ্রহী পাঠকের চাহিদা মিটতে পারে। আমি এ ধরণের গ্রন্থ রচনায় তাদের আগ্রহকে অগ্রাধিকার দিই যারা আমার মত ইতিহাস বিষয়ে খুব কম জানেন-বোঝেন কিন্তু জানা-বোঝার জন্য হৃদয়ে অদম্য ইচ্ছা লালন করেন। এ বই থেকে দিক নির্দেশনা পেয়ে তাঁদের মত যদি লাইব্রেরিতে কিছু সময় কাটান কিংবা অনলাইনে সার্চ করে জানতে চেষ্টা করেন তবে সেটাই হবে আমার চেষ্টার স্বার্থকতা। অন্যদিকে কারও জেরুজালেম বিষয়ে জানার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থটি যদি কিঞ্চিত পরিমাণ কাজে লাগে সেটা ব্যস্ত সময় পার করে দিনান্তে কয়েক’শ নির্ঘুম রাতে আমার নিরলস শ্রমের একান্ত প্রাপ্তি মনে করব।
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s