দোলাই নদীর গল্প


7853dc2ec15540169bde5d522c9ffb53রাজধানী ঢাকায় দোলাই নামে একটি নদী ছিল। যদিও নাগরিক ভাষ্যে এটি একদা খাল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল এবং হাল-আমলে দোলাই নদী ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে রাজপথ। পুরান ঢাকায় এখনও ধোলাইখাল নামে একটি এলাকা আছে, যে এলাকাটি মোটরপার্টসের দোকানের জন্য বিখ্যাত। আছে লোহারপুল ও কাঠেরপুল। পুল দুটি ছিল দোলাইয়ের ওপর। ধোলাইখাল, লোহারপুল, কাঠেরপুল, দোলাইরপাড় ইত্যাদি নাম মনে করিয়ে দেয় মৃত এক নদীর স্মৃতি। অথচ মোগল আমলের শুরুতেও দোলাই ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ ছিল বলে জানিয়েছেন সুলতানি ও মোগল আমল নিয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম। কোথায় ছিল দোলাই? ড. আবদুল করিম তার ‘ঢাকা :দ্য মোগল ক্যাপিটাল’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ হচ্ছে দোলাই, যার ওপরে লৌহ সেতু দ্বারা ফরাশগঞ্জ (মূলত ফ্রেন্সগঞ্জ) ও গেণ্ডারিয়াকে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এই খাল দেখতে প্রাকৃতিক খালের মতো।’ অর্থাৎ ড. করিমের সংশয় ছিল, খালটি প্রাকৃতিক নাকি কৃত্রিমভাবে খনন করা। তাই ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সুদূর অতীতে বালু নদীর নিচের ধারা দোলাই খাল দিয়ে প্রবাহিত হতো।’ এর পর দোলাইয়ের প্রবাহটির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বালু নদী কাপাসিয়ার কাছে লক্ষ্যা নদী থেকে নির্গত হয়ে ডেমরার অদূরে পুনরায় লক্ষ্যা নদীতে পতিত হয়েছে।’ লক্ষ্যা বলতে এখানে শীতলক্ষ্যা নদীকে বোঝানো হয়েছে। ড. করিমের বিবরণ অনুযায়ী, ‘দোলাই ডেমরা থেকে একটু উজানে বালু নদী থেকে নির্গত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ঢাকার শহরের মধ্য দিয়ে আধুনিক মিল ব্যারাক এলাকার পাশে (মির্জা নাথনের মতে দোলাইয়ের একটি শাখা) বুড়িগঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। কিন্তু বালু নদী থেকে নির্গমস্থলের সামান্য দক্ষিণে দোলাই নদী দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে_ একটি শাখা উত্তর দিকে চলে গেছে এবং অন্য শাখা বর্তমান ঢাকার শাহবাগ হোটেলের উত্তর পাশে ঢাকা-তেজগাঁও সড়ক অতিক্রম করে সরাসরি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে।’ বাংলাপিডিয়ার চতুর্থ খণ্ডে মোগল সুবাদার ইসলাম খান কর্তৃক ১৬০৮-১৬১০ সালের দিকে ঢাকায় খনন করা একটি খালকে দোলাই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পিএইচডি গবেষক আদনান আরিফ সালিম দোলাই খনন নিয়ে ঐতিহাসিক পরিসর থেকে নানা অনিশ্চয়তা থাকায় তথ্যটি মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘লভ্য তথ্যসূত্র থেকে একটু খেয়াল করলে স্পষ্ট হয়, অন্তত ১৬০৮-১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম খানের পক্ষে ঢাকায় খাল খনন সম্ভব নয়। আমরা জানি, ইসলাম খানকে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবাদার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। বারোভুঁইয়াকে পরাজিত করে সুবাদার হিসেবে ঢাকায় পেঁৗছাতে তার ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ লেগে যায়। বিষয়টি আমলে নিলে খাল হিসেবে দোলাইয়ের খনন প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।’ সুবাদার ইসলাম খানের ঢাকায় পেঁৗছাতে যে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময় লেগেছিল, তা ড. আবদুল করিমের ‘ঢাকা :দ্য মোগল ক্যাপিটাল’ থেকেও নিশ্চিত হওয়া যায়। মির্জা নাথনের ‘বাহারীস্তান-ই-ঘায়বী’ থেকে তথ্য উল্লেখ করে ড. আবদুল করিম লিখেছেন, ১৬১০ সালের জুলাই মাসের কোনো একসময় মির্জা নাথন ও তার পিতা ইহতিমাম খান ঢাকায় বেগ মুরাদ খানের দুটি কেল্লার (আধুনিক মিল ব্যারাক এলাকায়, যেখানে দোলাই ও বুড়িগঙ্গা মিলিত হয়েছে) কাছে কোনো জায়গায় পেঁৗছেন। ইসলাম খান তাদের কয়েক দিন আগে ঢাকায় পেঁৗছেন এবং পিতা-পুত্রকে অভ্যর্থনা জানান। ইসলাম খান দোলাই খাল খনন করেছেন এমন কোনো তথ্য উপস্থাপন করেননি ড. আবদুল করিমও। তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকায় ইসলাম খানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান এখনও দৃশ্যমান। তা হচ্ছে মালিটোলা-তাঁতীবাজারের কোনায় বুড়িগঙ্গা ও দোলাইয়ের সংযোগ খাল খনন।’ ড. করিমের ‘ঢাকা :দ্য মোগল ক্যাপিটাল’ ১৯৬৪ সালে যখন ঢাকাস্থ এশিয়াটিক সোসাইটি অব পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয়, তখনও দোলাই অস্তিত্ববান ছিল।

ইতিহাসবিদ ও ঢাকা গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকা :স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে নলিনীকান্ত ভট্টশালীকে উদৃব্দত করে লেখা হয়েছে, ‘ভট্টশালী লিখেছেন, বুড়িগঙ্গার কোনো নামই উল্লেখ করেননি নাথন, যার তীরে অবস্থিত বর্তমান ঢাকা। সুতরাং ধরে নেওয়া যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা পরিচিত ছিল দোলাই নামে।’ ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্তি্বক গবেষক এ কে এম শাহনাওয়াজ অবশ্য এমনটা মানতে নারাজ। তার দাবি, ‘ধোলাইখাল বলে পরিচিত জলধারা এককালে একটি পরিপূর্ণ উপনদী ছিল। ঢাকার পূর্বাঞ্চলে উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে বালু নদের ধারা। বালু শীতলক্ষ্যার শাখা নদ। শীতলক্ষ্যা থেকে বেরিয়ে উত্তরে প্রবাহিত হওয়ার আগে ডেমরার কাছে সৃষ্টি হয়েছিল দোলাই।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকার ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগে, আমি ভাবি মোগলরা গাজীপুরে শেল্টার না নিয়ে ঢাকায় এলো কেন? তাদের যোগাযোগ করতে হবে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে, শীতলক্ষ্যা দিয়ে গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে যাওয়া অনেক সহজ ছিল। তুলনায় ঢাকা থেকে বুড়িগঙ্গা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের দূরত্ব অনেক বেশি।’ তিনি বলেন, তবু মোগলরা ঢাকায় এসেছিল কেন_ এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় মির্জা নাথনের ‘বাহারীস্তান-ই-ঘায়বী’ থেকে। ইসলাম খানের সমসাময়িক ঐতিহাসিক নাথন লিখেছেন দোলাই দিয়ে তাদের যাতায়াতের বিবরণ। প্রাচীন সূত্রমতে, শীতলক্ষ্যা থেকে বেরিয়ে উত্তরে প্রবাহিত হওয়ার আগে ডেমরার কাছে সৃষ্ট ধারাটির নামই দোলাই, যা পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঢাকার বুক চিরে এঁকেবেঁকে বুড়িগঙ্গা নদীতে পড়েছিল। আজকের গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর প্রভৃতি লোকালয় এ দোলাইয়ের তীর ধরেই গড়ে ওঠে। ১৪ থেকে ২০ শতক পর্যন্ত ঢাকা নগরীর বিকাশে দোলাই নদী, অতঃপর খালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ নদীকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে।

অধ্যাপক শাহনাওয়াজের মতে, প্রচলিত আখ্যানগুলো সামনে রেখে রচিত ইতিহাস যেমন ঢাকার প্রকৃত বয়স বিকৃতির জন্য দায়ী, তেমনি বুড়িগঙ্গানির্ভর মোগল রাজধানী ঢাকাকে বর্ণনা করার প্রবণতা ইতিহাসকে খণ্ডিত করেছে। মোগল রাজধানী ঢাকাকে বিবেচনায় নিয়ে যদি ৪০০ বছরের দাবি করা হয়, তাহলে সেখান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকার আরও ৪০০ বছরের বেশি সময়। তাই আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে দোলাই তীরের ঢাকাকেও। প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া বলেন, পুরান ঢাকার বংশাল এলাকা, নয়াবাজার, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, সাবেক ভিক্টোরিয়া পার্কের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নারিন্দা, জালিয়ানগর, নবাবপুর রোডের প্রাচীন মানচিত্র দেখলে বোঝা যায়, ওই সব এলাকায় একের অধিক নদীর অস্তিত্ব ছিল। তার মতে, ঢাকায় মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠার পরেই দোলাই শুকিয়ে যেতে থাকে। ব্রিটিশ আমলে নদীর পূর্ব দিকের ধারা একেবারেই শুকিয়ে যায় এবং দোলাই নদীটি ক্রমে মানুষের মুখে মুখে ধোলাইখাল বলে পরিচিতি পেতে শুরু করে।দোলাই নিয়ে গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের একটি জীবন্ত বর্ণনা পাওয়া যায় সমরেশ বসুর ‘কোথায় পাবো তারে’ উপন্যাস থেকে। এটি সমরেশের কালকূট ছদ্মনামে লেখা উপন্যাসগুলোর একটি। কালকূট নামে সমরেশের ভ্রমণোপন্যাসগুলোতে তার ব্যক্তিগত স্মৃতিও আছে। ‘কোথায় পাবো তারে’ উপন্যাসে ছেলেটা নামে যে চরিত্রটি দোলাই থেকে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত কোষা নৌকা চালিয়ে যায়, সেই ছেলেটা শৈশবের সমরেশ হবেন, যার নিজের ছেলেবেলাটা কেটেছে কখনও ঢাকায়, কখনও আবার বিক্রমপুরে, গত শতাব্দীর বিশের শতকের দ্বিতীয় ও তিরিশের দশকের প্রথম ভাগে। উপন্যাসের ছেলেটার চরিত্রটি থাকে জিয়সের গলিতে, যে গলি থেকে এক দৌড়ে চলে যাওয়ায় একরামপুরের বড় রাস্তায়। একদিন সে নৌকা চালিয়ে বুড়িগঙ্গায় যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নারিন্দার পুল পেরিয়ে এগিয়ে যায়।

নারিন্দার পুলের নিচে তখন ‘বহে যায় তরতরানো খাল’। এই খালটিই দোলাই, তা একটু পরে ছেলেটি নিজেই জানিয়ে দেয়। গেণ্ডারিয়া যাবে বলে পুলের কাছে এক মহল্লা থেকে কোষা নৌকা ভাড়া করে সে সীতানাথের আখড়ার মাঠ পেরিয়ে বাঁয়ে গেণ্ডারিয়া, ডানে কলুটোলা রেখে এগিয়ে যায়। ‘গেণ্ডারিয়ার খেয়াঘাট পেরিয়ে ডিঙ্গা তখনো সূত্রাপুর বাজারের কাছে। সামনে লোহার পুল। চওড়া বড় ঝোলানো পুল, তার ওপর দিয়ে গাড়ি ঘোড়া চলে। পুল পেরিয়ে আবার একটা বাঁক।’ পথে সে বুড়িগঙ্গা থেকে শহরের দিকে ফেরা জেলেদের দেখে ছেলেটি। ছেলেটি ‘লোহার পুল পেরিয়ে, ফৌজী ব্যারাকের ডাঙা ছুঁয়েছে। এবার ডানদিকে বাঁক। তারপর বাঁক নিলেই বুড়িগঙ্গা।’ বুড়িগঙ্গা আছে এখনও, নেই দোলাইয়ের অস্তিত্ব। লোহারপুল এলাকার সত্তরোর্ধ্ব সালামত আলী জানালেন, ছোটবেলায় দোলাই খালে সাঁতার কাটার স্মৃতি ভোলেননি তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন যেখানটায় সূত্রাপুর থানা রয়েছে, তার থেকে একটু এগিয়ে জহির রায়হান মিলনায়তনসংলগ্ন এলাকায় ছিল বিখ্যাত লোহারপুল। পুলটির স্মৃতিচিহ্ন ছিল নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকেও। তিনি বলেন, দোলাই এখনও আছে রাজপথের নিচের কালভার্টে।

লিখেছেন: রাজীব নূর। বিশেষ প্রতিবেদক; দৈনিক সমকাল। [পূর্বে সমকালে প্রকাশিত]

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s