বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প


28socials3bigমানব সংস্কৃতির ঐতিহাসিক আবর্তন যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ওপর নির্ভর করে বিশ্লেষণ করতে হয় তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মৃৎপাত্র। একজন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক হিসেবে এই মৃৎপাত্রের ভাঙ্গাচোরা টুকরাগুলোকে অনেক বিরক্তির, যন্ত্রণাদায়ক ও কষ্টকর গবেষণা উপকরণ হিসেবেই মনে হয়েছে। কোনো প্রত্নস্থান থেকে নানা উপায়ে যে প্রত্ন উপকরণ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তা হচ্ছে পর্ট সার্ড তথা এই খোলামকুচিই। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে যখন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান উয়ারী-বটেশ্বরের খনন কাজে অংশ নিয়েছিলাম তখন থেকেই পরিচয় নানা ধরনের মৃৎপাত্রের টুকরা আর গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের সাথে।
উয়ারী-বটেশ্বর থেকে প্রাপ্ত মৃৎপাত্রগুলোর মধ্যে সবার আগে বলা যেতে পারে কালো-ও-লাল মৃৎপাত্র, উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্র কিংবা কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্রের কথা। প্রাথমিকভাবে ধরে নেয়া যায় এই বিশেষ মৃৎপাত্রের মধ্যে কালো-ও-লাল মৃৎপাত্র প্রাপ্তি বাংলার ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে। বিশ্বের কোনো স্থানে একই সাথে তামা ও পাথরের সংস্কৃতির দেখা মিললে তাকে তাম্র প্রস্তর যুগ পদবন্ধে সংজ্ঞায়িত করে লেখা হয় ইতিহাস। আর গাঙেয় অববাহিকার কোনো স্থানে পাথরের হাতিয়ার দুষ্প্রাপ্য হেতু সেখানকার তাম্রপ্রস্তর সমকালীন সংস্কৃতির নির্দেশক ধরা হয় এই কালো-ও-লাল মৃৎপাত্রকেই।
অন্যদিকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের দিকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্র প্রাপ্তি বাংলার ইতিহাসে ব্যাপ্তিকাল হিসেবে দিয়েছে আরো কয়েকটি শতক। সাধারণত সূক্ষ্ম ও পাতলা বুননের এই মৃৎপাত্র সমকালীন আভিজাত্যের পরিচয় বহন করে। নিজের কর্মাভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থানে প্রাপ্ত নিদর্শনের আলোকে প্রথম বর্ণনা শুরু করেছি। তবে সেই সাথে এটুকু বলে রাখা ভালো যে বাংলাদেশের সবগুলো প্রত্নস্থান খনন কিংবা উপরিপৃষ্ঠীয় সংগ্রহে দেখা মিলেছে বিচিত্র ধরনের মৃৎপাত্র। বাংলাদেশের হিসেব করলে মহাস্থানগড়, গোবিন্দ ভিটা, ভাসুবিহার, রাজা হরিশচন্দ্রের বাড়ি, শালবন বিহার কিংবা পাহাড়পুর সব প্রত্নস্থান থেকেই দেখা মিলেছে বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্রের। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের পাণ্ডু রাজার ঢিবি, মহিষদল, ভরতপুর, মঙ্গলকোর্ট, চন্দ্রকেতুগড়, তমলুক, বানগড়, রাজবাড়ীডাঙ্গা প্রভৃতি প্রত্নস্থল থেকেও আবিষ্কৃত হয়েছে নানা ধরনের মৃৎপাত্র।
বিশ্বের অন্য সবখানের মত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রত্নস্থান হতে মূলত দুইভাবে দেখা মিলেছে বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্রের। কোনো স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালানো হলে সেখানকার সাইট কন্টেন্ট বোঝার জন্য সংগ্রহ করা হয় প্রত্নসমতলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃৎপাত্রের টুকরা। এগুলোর স্থানিক বিন্যাস নিয়েও হয় বিস্তর গবেষণা। বিশেষ করে প্রত্নঅঞ্চলের বিস্তৃতি ও প্রাচীন বসতির আকৃতিগত দিক বিশ্লেষণের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রত্নস্থান খনন করার সময় বিভিন্ন স্তরে পাওয়া যায় বৈচিত্র্যময় সব মৃৎপাত্র। বাংলাদেশে প্রাপ্ত মৃৎপাত্রের মধ্যে রয়েছে কালো-ও-লাল মৃৎপাত্র, উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্র, রুলেটেড মৃৎপাত্র, অ্যামফোরা, কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র, নবযুক্ত মৃৎপাত্র, ফ্যাকাশে লাল মৃৎপাত্র প্রভৃতি। এক্ষেত্রে নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে আদি ঐতিহাসিক যুগের মৃৎপাত্রের বিশেষ শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে প্রাক-মধ্যযুগ, মধ্যযুগ এবং পরবর্তী মধ্যযুগের মৃৎপাত্রের মধ্যে তেমন কোনো বিশেষত্ব কিংবা বৈশিষ্ট্য নেই বললেই চলে।
বিভিন্ন নদী অববাহিকা অঞ্চলের মাটি মৃৎপাত্র তৈরির জন্য বেশ ভালো। এদিকে গঙ্গা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাজুড়ে বিস্তৃত বাংলার মানববসতি তাই হয়ে উঠেছে এর পীঠস্থান। ধরতে গেলে সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় মৃৎপাত্র-নির্মাণ বিশেষ শিল্পকর্ম হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে। আজ থেকে প্রায় অর্ধশত বছর পূর্বেও গ্রামীণ বাংলার ঘরে ঘরে রান্নার হাঁড়ি, খাবার থালা, গ্লাস, বাটি, কলস প্রভৃতি আকারে দেখা মিলত মাটির তৈরি পাত্রের। এদিকে শস্য রাখার আধার, উপঢৌকন, নৈবেদ্য এবং গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবে মৃৎপাত্রই ব্যবহার হতে দেখা যায়। আর সেদিক থেকে বিচার করতে গেলে বাংলাদেশে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা ও শিল্প-ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে এই মৃৎপাত্র। ভূমিরূপগত কারণে উপযুক্ত কাঁচামালের সহজলভ্যতা বিশেষ করে কাদামাটির নমনীয়তা সফল গতি দান করেছে এদেশে মৃৎশিল্পের বিকাশকে। তাই বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিল্প-ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মৃৎপাত্রের বিশ্লেষণ। বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকগণ কিংবা ইতিহাসবিদদের আলোচনায় দীর্ঘদিন থেকে মৃৎপাত্রকে ইতিহাসের উৎস হিসেবে তেমন গুরুত্ব না দেয়ায় স্থানীয় মৃৎপাত্র সম্পর্কিত তথ্য আজও পর্যাপ্ত নয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে বাংলাদেশ থেকে দুই ধরনের প্রাচীন মৃৎপাত্রের দেখা মিলেছে। বাহ্যিক গঠনের আলোকে এর শনাক্তযোগ্যতা কিংবা শনাক্ত করার অযোগ্য হিসেবে এর এই শ্রেণিকরণ। মৃৎপাত্র বিষয়ক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ক্লাইভ অর্টন এর সন্নিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছেন চারটি বিশেষ গাঠনিক উপকরণকে। এর মধ্যে রয়েছে কান্দা, গলা, দেহ ও ভিত্তি তলদেশ। এগুলোর মাধ্যমেই প্রাপ্ত মৃৎপাত্রটিকে তার ব্যবহার প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রেণিকরণ করা যায়। অন্তত এর ভিত্তিতেই কোনো মৃৎপাত্রের টুকরা আসলে হাঁড়ি, বাটি, গামলা, থালা, ফুলদানি, কলস, সোরাই, পাত্রপাত্র, ধারক, সরা, ঢাকনা কিংবা কাপ জাতীয় ছিল কিনা তা বের করা যায় এর মাধ্যমেই। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থান থেকে প্রাপ্ত মৃৎপাত্রের টুকরা থেকে এ জাতীয় প্রায় সব ধরনের নিদর্শনেরই দেখা মিলেছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থান থেকে যে মৃৎপাত্রের দেখা মিলেছে তার মধ্যে থেকে বয়সের ধারাবাহিকতায় কালো-ও-লাল মৃৎপাত্র, উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্র, কালো চকচকে মৃৎপাত্র, রুলেটেড মৃৎপাত্র, গেজড মৃৎপাত্র, অ্যামফোরা জাতীয় মৃৎপাত্র, ছিদ্রযুক্ত মৃৎপাত্র, নবযুক্ত মৃৎপাত্র, ফ্যাকাশে মৃৎপাত্র, স্ট্যাম্পড মৃৎপাত্র, ধূসর মৃৎপাত্র, লাল প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র, চিনামাটির পাত্র ও চিত্রিত মৃৎপাত্রের কথা বলা যেতে পারে। এর মধ্যে অভ্যন্তর-ভাগ এবং বহির্দেশের ওপরের অংশ কালো এবং বহির্দেশের অবশিষ্ট অংশে লাল মৃৎপাত্রটি তাম্রপ্রস্তর যুগের প্রতিনিধিত্বকারী। বিভিন্ন ধরনের বাটি, নলযুক্ত বাটি, গামলা, সরু-গলাযুক্ত পাত্র, থামের ওপর বসানো থালা ও ফুলদানি-স্ট্যান্ড হিসেবে এর দেখা মেলে। পশ্চিমবঙ্গের ১০৫টি প্রত্নস্থলের পাশাপাশি উয়ারী-বটেশ্বরে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এই বিশেষ মৃৎপাত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তাকার প্রান্তসহ গলা এবং কিছু ভগ্নাংশ পাওয়া যায় বলে প্রত্নতাত্ত্বিক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান দাবি করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণ এবং রক্তিম মৃৎপাত্র সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান হলো পাণ্ডু রাজার ঢিবি, ভরতপুর, বানেশ্বরডাঙ্গা, মঙ্গলকোর্ট। পক্ষান্তরে আমাদের বাংলাদেশে মহাস্থানগড় ও উয়ারী-বটেশ্বরের পুরাতন পল্লভূমির লালমাটিতে অবস্থিত প্রত্নস্থানেও দেখা মিলেছে এ বিশেষ মৃৎপাত্রের। তবে মহারাষ্ট্রের ইনামগাঁওয়ের সাথে তুলনা করে উয়ারী-বটেশ্বরের সাম্প্রতিক উৎখননে কালো-ও-লাল মৃৎপাত্রের সাথে একই স্তরে গর্ত-বসতি আবিষ্কারের কথাও উঠেছে গবেষকদের পক্ষ থেকে। পরিবেশগত নানা দিক নিয়ে বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক।
কালানুক্রম অনুযায়ী উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্রকে প্রাথমিক (৭০০-৩০০ খ্রিস্টপূর্ব) এবং পরিণত (৪০০-১০০ খ্রিস্টপূর্ব) দুই পর্যায়ের বলে ধরা যেতে পারে। বাংলাদেশে মহাস্থানগড় ও উয়ারী-বটেশ্বরের পাশাপাশি ওপার বাংলার মঙ্গলকোর্ট, চন্দ্রকেতুগড় এবং বানগড় তথা কোটিবর্ষ থেকেও দেখা মেলে এ বিশেষ মৃৎপাত্রের। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে এর সাথে বৌদ্ধধর্মের বিকাশ, বাণিজ্য বিস্তার, আভিজাত্য ও নগর-সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সূক্ষ্ম ও পাতলা বুননে তৈরি উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্রের কোর বা মজ্জা কালো থেকে ধূসর রঙের হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রত্নস্থানে প্রাপ্ত ৯০ শতাংশ উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্রের রঙ জমকালো এবং বাদামি-কালো। তবে বাকি ১০ শতাংশে নীল, গোলাপি, রুপালি, সোনালি, বাদামি, চকোলেট, বেগুনি ও গাঢ় লালের মত বর্ণবৈচিত্র্য চোখে পড়ে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নকশাহীন এ মৃৎপাত্রে কখনও কখনও দেখা মেলে সরু ও পুরু আনুভূমিক বলয়, উলম্ব আঁচড়, আনুভূমিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসা উলম্ব আঁচড়, আড়াআড়ি বলয়, গোলাকৃতির বন্ধনী বা খিলানাকৃতির নকশা। উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রে রঙের নকশা ছাড়াও খোদাই করা নকশা এবং গ্রাফিটি দাগও দেখা যায়। চমকপ্রদ আকৃতির এ মৃৎপাত্রে থালা, বাটি ও ঢাকনার পাশাপাশি দীর্ঘ গলাযুক্ত পাত্র, পিরিচ, ক্ষুদ্রাকৃতির ভাজন, নলযুক্ত পাত্র ও সুরাপাত্রেরও দেখা মিলেছে। তবে এর তৈরি ভারি ও বড় বড় পাত্র যেমন শস্যাধার, জলাধার, বড় পানির কুঁজো বা সোরাহি প্রভৃতির দেখা মেলেনি। সবমিলিয়ে এ ধরনের মৃৎপাত্রগুলো খুবই অভিজাত ধরনের যা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে প্রাচীন ভারত বা দক্ষিণ এশিয়াই শুধু নয়, বরং প্রাচীন বিশ্বের অন্যান্য উৎকৃষ্ট মৃৎপাত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। তাইতো এ ধরনের ভাঙা মৃৎপাত্র তামার পাত দিয়ে জোড়া লাগানোর মত নিদর্শনও আবিষ্কৃত হয়েছে নানা প্রত্নস্থান থেকে।
চকচকে বৈশিষ্ট্যটি বাদ দিলে কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্রের সাথে উত্তরাঞ্চলীয় কালো চকচকে মৃৎপাত্রের তেমন কোনো পার্থক্য নাই। বাংলাদেশের মহাস্থানগড় ও উয়ারী-বটেশ্বরের পাশাপাশি ওপার বাংলায় বানগড়, চন্দ্রকেতুগড়, মহিষদল থেকে দেখা মেলে প্রচুর পরিমাণ কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র। নানা প্রকারের বাটির পাশাপাশি থালা, দীর্ঘ গলাযুক্ত পাত্র, ছোট ও বড় ভজনপাত্র, নলযুক্ত পাত্র, থামসহ থালা ও বাটি প্রভৃতির দেখা মিলেছে কালো প্রলেপযুক্ত পাত্র হিসেবে। প্রাচীনকালে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বাণিজ্যিক বিকাশ চিহ্নিত করতে রুলেটেড মৃৎপাত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। মহাস্থানগড়, উয়ারী-বটেশ্বর, তমলুক এবং চন্দ্রকেতুগড় থেকে এই মৃৎপাত্রের দেখা মিলেছে। এর মাধ্যমে বাংলার সাথে দক্ষিণ ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিচয় মেলে। রুলেটেড মৃৎপাত্র মূলত বিশেষ ধরনের থালা। এর কান্দা ভারি ও বাঁকানো, তলায় কোনো ঠেস দেয়া নাই, নিচের অংশ এবং কান্দা সংযুক্ত। তলদেশ মসৃণ ও উজ্জ্বল হওয়ার পাশাপাশি ভেতরের অংশে বৃত্তাকার নকশায় খাঁজকাটা। এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত দিয়ে তিন থেকে দশ সারি খাঁজকাটা নকশা তৈরি করতে দেখা যায়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে সময়ানুক্রমে পাওয়া গেছে নানা ধরনের গেজ দেয়া মৃৎপাত্র। যেগুলো গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের দিক অনন্য মান ধারণ করে সমৃদ্ধ করেছে বাংলার শিল্প ইতিহাসকে। বাংলাদেশ, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রত্নস্থান থেকে দেখা মিলেছে বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের নবযুক্ত মৃৎপাত্রের। তবে বাংলাদেশের একমাত্র উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থান থেকেই পাওয়া গিয়েছে এই বিশেষ মৃৎপাত্র। এ পাত্রে ঠিক মাঝ বরাবর একটি নব রয়েছে। নবটিকে কেন্দ্র করে চারদিকে বৃত্তাকারে ৭-১০টি খাঁজকাটা দাগ দৃষ্টিগোচর হয়।
বিভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতি অথবা ফুল-লতাপাতা ইত্যাদি নকশা-সমৃদ্ধ স্ট্যাম্পড মৃৎপাত্রও পাওয়া গেছে পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড় এবং বানগড়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর এবং মহাস্থানগড় উৎখননে। উয়ারী-বটেশ্বর থেকে প্রাপ্ত একটি মৃৎপাত্রে এমনি অলংকরণ চোখে পড়ে যার শিল্পগত তাৎপর্য থাকলেও থাকতে পারে। ছাঁকনি হিসেবে কিংবা শুকনো খাবার থেকে বালি কণা ঝাড়তে ছিদ্রযুক্ত মৃৎপাত্রের ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর ও মহাস্থানগড় খননে দেখা মিলেছে বিচিত্র ধরনের ছিদ্রযুক্ত মৃৎপাত্রের। এদিকে বিভিন্ন প্রত্নস্থান থেকে আবিষ্কৃত চিত্রিত মৃৎপাত্র, গ্রাফিটি মৃৎপাত্র, লাল প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র, ফ্যাকাশে লাল মৃৎপাত্র কিংবা ধূসর মৃৎপাত্রও ঐতিহ্যগত দিক কিংবা শিল্প ইতিহাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বলা যেতে পারে চীন থেকে আমদানিকৃত বিশেষ পাত্রের কথাও। মূলত ১৬ শতকের দিকে পর্তুগিজ ধর্মযাজকদের হাত ধরেই এসব পাত্র ইউরোপ ঘুরে বাংলায় আসে। ইতিহাসবেত্তা আল-বেরুনী চীন থেকে ভারত উপমহাদেশে সিলাডন পাত্র রপ্তানির কথা উল্লেখ করেছেন। তবে পশু হাড়ের গুঁড়া মেশানোর ট্যাবু ভারত উপমহাদেশের হিন্দু সমাজে এ পাত্রকে তেমন জনপ্রিয় হতে দেয়নি। তবে সময়ের আবর্তে এদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পোর্সেলিন ও সিলাডন জাতীয় মৃৎপাত্র।
বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক খননে যেমন মৃৎপাত্র খণ্ডাংশের দেখা মিলেছে তা বাংলা ভূখণ্ডে হাজার বছরের মৃৎশিল্প ঐতিহ্যকে তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। ধীরে ধীরে প্রযুক্তির প্রসার ধাতব হাঁড়ি পাতিল সরিয়ে দিয়ে দৈনন্দিন কাজে যেখানে যুক্ত করেছে বিভিন্ন ধরনের ননস্টিকি প্যান, জার, বাটি ও পেট; সেখানে বিভিন্ন ধরনের কাচ ও উন্নত সিরামিকের ব্যবহারে হারিয়ে যেতে বসেছে মৃৎপাত্র। তবে গ্রামবাংলার কোনো কোনো স্থানে আজও মৃৎপাত্রের চল রয়েছে। সেখানে নিত্যদিনের কাজে প্রয়োজনীয় হাঁড়ি-কলসি বাদেও শীতকালে খেজুর রসের হাঁড়ি, ঘটকা, টোপা, টেপি, ঝাঁঝর, ছাপনা, খোরা, গামলা, চারী, ঢাকনা, হাতা, শখের হাঁড়ি, ঘট, শীতল-ঘট, নাগ-ঘট, মনসা-ঘট, মঙ্গল-ঘট, মহররম-ঘট, গাজি-ঘট, পিঠার সরা, বিভিন্ন ধরনের সানকি ও মালসার পাশাপাশি লক্ষ্মীসরার প্রচলন রয়েছে আজও। এদিকে শহুরে ঘরবাড়ির সাজেও চোখে পড়ে বিভিন্ন ধরনের টালি, ফলের অবয়ব, ফুলদানি, টব, হাতি, ঘোড়া, যুদ্ধজাহাজ, কৃষক-জেলে-বাউলের প্রতিকৃতি, পাখি, হাঁস-মুরগি, কবুতর, কিংবা ময়ূরের পাশাপাশি চোখে পড়ে বিভিন্ন ধরনের কলমদানি ও ল্যাম্প স্ট্যান্ড। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমাণ ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এর সবই আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s