বিশ্ববাণিজ্যে গুজরাটের আধিপত্য


surat-diamond_660_070312085248ব্রিটিশ  সাম্রাজ্যবাদীরা যখন নতুন জয় করা অঞ্চল হিসেবে আফ্রিকার জঙ্গলের নানা  স্থানে নিজেদের প্রভাববলয় বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন তাদের প্রজাদের  কেউ কেউ একই পতাকাতলে থেকে আরো অনেক দূর বিস্তৃত করেছে নিজেদের চিন্তার  পরিসর। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আল্লিদিনা বিশ্রাম (Allidina Visram)—  যিনি কুচ তথা বর্তমান ভারতের গুজরাট অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। একেবারে  কপর্দকশূন্য অবস্থায় মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি বর্তমান তাঞ্জানিয়ার জাঞ্জিবার  অঞ্চলে পৌঁছেছিলেন। এরও প্রায় ১৪ বছর পর তিনি সেখানে একটি ছোট্ট দোকান  প্রতিষ্ঠা করেন, যা ধীরে ধীরে একদিন তার সৌভাগ্যের দ্বার উন্মোচন করে দেয়।  পর্যায়ক্রমে ১৯০০ সালের প্রথম দিকে কেনিয়া থেকে উগান্ডার প্রায় ৫৮০ মাইল  বিস্তৃত এলাকায় তিনি প্রতিটি বড় বড় রেলস্টেশনের পাশে একটি করে দোকান  খুলেছিলেন, যা থেকে রেলওয়েতে কর্মরত হাজারো মানুষের প্রয়োজনীয় মালসামানা  জোগান দেয়া হতো। এর পর তিনি ভিক্টোরিয়া লেকের কাছাকাছি জিঞ্জাতে আরো কিছু  দোকান খুলেছিলেন।

সহজেই সাফল্য এসে  ধরা দেয়ায় এর পর বিশ্রাম আরেকজন গুজরাটি বিথালদাশ হরিদাসের (Vithaldas  Haridas) সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি ১৮৯৩ সালের দিকে এ অঞ্চলে পা রাখেন, যিনি  তার পরামর্শদাতার চেয়েও অনেক রোমাঞ্চক ছিলেন বলেই প্রায় ২৪ মাইল জঙ্গল  মাড়িয়ে তার পক্ষে আইগঙ্গার (Iganga) মতো ছোট্ট শহরে পা রাখা সম্ভব হয়েছিল;  যেখানে তিনি তার প্রথম দোকানের পত্তন করেছিলেন। এরই পথ ধরে আরো অনেকে পা  রেখেছিলেন ঔপনিবেশিক আফ্রিকায়, শেষ পর্যন্ত যাদের জন্য ব্যবসা বিস্তারের এক  বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়।

দূরত্ব কিংবা  গরমের মতো ছোটখাটো বিষয় কখনই গুজরাটিদের কাজ থেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।  সম্প্রতি তারা কানাডার সবচেয়ে প্রখ্যাত অভিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব  করছে, যেখানে পৃথিবীর আরেক প্রান্ত বলা যেতে পারে, এমন স্থান  নিউজিল্যান্ডেও তাদের প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার অভিবাসী গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে।   কম্পাসের কাঁটা দিকনির্দেশের জন্য যেদিকেই ঘোরানো হোক না কেন; ফিজি থেকে  ব্রিটেন, মিয়ানমার থেকে উগান্ডা, সেখানেই তারা তাদের সম্প্রদায়ের জন্য  সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছেন। এক গুজরাটি সংঘটনের দাবি ‘কেবল  সেসব দেশেই তাদের সম্প্রদায় পা রাখেনি, উপরন্তু পা রেখেছে অনেক অনুন্নত  কিংবা ছোট দ্বীপ যেখানে বাণিজ্য বিস্তারে সুযোগ একেবারেই কম।’

ব্যবসাই  গুজরাটিদের সবচেয়ে বড় কারবার। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের দেখা মেলে,  যেখানে কোনো না কোনো ব্যবসার সঙ্গে তারা জড়িত; যার মধ্যে ছোট দোকান থেকে  হোটেল, বিশ্বের ছোটখাটো দেশগুলো থেকে শুরু করে পরাশক্তির দেশগুলোতেও  দেখা  মেলে তাদের। ইহুদি, চৈনিক, ব্রিটিশ, স্কট ও লেবানিজদের মতো তারাই বিশ্বের  পুরোটা জুড়ে একটা প্রভাবশালী বিজনেস নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছে।  তারা তাদের সংখ্যানুপাতে (ভারতে ৬৩ মিলিয়ন আর বাইরে সব মিলিয়ে ৩ থেকে ৯  মিলিয়নের মতো হবে) অনেকটাই সফল দাবি করতে পারে আজ। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায়  প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজ তাদের বিচরণ লক্ষ করা যায়, যার মাধ্যমে তারা একটি  রাষ্ট্রে উত্থান থেকে পতনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে অনেকগুলো  প্রভাবশালী অর্থনীতির দেশেও তাদের প্রভাব আজ চোখে পড়ার মতো।

আমেরিকার  কথাই চিন্তা করা যাক। ১৯৬০ সালের দিকে এখানে গুজরাটিদের আগমন ঘটে।  বর্তমানে তারা এখানকার হোটেল-মোটেলের প্রায় সিংহভাগ চালাচ্ছে। তদ্ব্যতীত  এটা শুধু একটি গ্রুপ তথা প্যাটেলদের একটি পরিবারের অর্জন, যারা সুরাট ও  বারোদার মধ্যবর্তী একটি অনুন্নত গ্রাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিল।  দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সব মানুষের মতো তারাও মেডিসিন ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের  ডিগ্রিকে বেশ কদর করে। তবে তারা জানে, কীভাবে একটা ডিগ্রি থেকে ব্যবসার  প্রসার ঘটানো যায়। এজন্যই তারা আজ আমেরিকায় স্বতন্ত্রভাবে গড়ে ওঠা  ফার্মেসির (অনেকটা ব্রিটেনের সঙ্গে তুলনীয়) অর্ধেক (১২ হাজার) মালিকানা  অর্জন করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রে হাজারখানেক গুজরাটি ডাক্তার রয়েছেন, যারা  অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষের তুলনায় অতিদ্রুত এখানে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন।  ১৯৭১ সালে আমেরিকা আসার আগে ভুপ্রেন্দ্র পাতিল (Bhupendra Patel) বারোদায়  মেডিসিন বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন। এখানে প্র্যাকটিস শুরুর মাত্র চার বছরের  মাথায় তিনি নিউইয়র্কের কুইন্সে একটা নিজস্ব ভবন স্থাপন করতে পেরেছেন। যার  ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের দিকে এসে দেখা যায়, ৩০ জনের মতো ডাক্তার তার হয়ে  কাজ করছেন। এর দেখাদেখি তার সহপাঠীরা পর্যন্ত আকৃষ্ট হন। একটা পর্যায়ে এসে  দেখা যায়, তার ১২০ সহকর্মীর মধ্য থেকে ৯০ জন দেশ থেকে এসে আমেরিকায় এসে তার  সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।

এমনি অনেক গল্প  রয়েছে, যেগুলো গুজরাটিদের সম্পর্কে বিশদ আকারে জানার সুযোগ করে দিতে পারে।  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, গুজরাটিদের মধ্যে যারা ব্যবসায় হাত  দিয়েছেন, তারা মনে করেন, বিশ্বের কোনো মানুষের অধীনে কাজ করার জন্য তাদের  জন্ম হয়নি। এজন্য তারা নিজের জন্যই কাজ করেন। এক্ষেত্রে নিজ নিজ ব্যবসায়  মনোযোগী হওয়াই তাদের জন্য উত্তম সমাধান। বিখ্যাত ডায়মন্ড প্রসেসর রোজি  ব্লুর প্রধান রাসেল মেহতা বলেছেন, ‘নিজের লক্ষ্য অর্জনের চাবি নিজ হাতে  তুলে নিতে হবে।’ এজন্যই এসব মানুষের কাছে উদ্যোগ আর কিছুই নয়, একটি  সাংস্কৃতিক দায়িত্ব; যা শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সম্মানই বয়ে আনছে তাদের জন্য।  তাই তারা ছোট্ট একটি কর্নার-শপ প্রতিষ্ঠা করাকেও কোনো কোম্পানিতে ভালো  বেতনে মাঝারি পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত পদে চাকরির চেয়ে সম্মানের মনে  করেন।

ক্ষুদ্র উদ্যোগও হতে পারে প্রভাববিস্তারী

বেশির  ভাগ গুজরাটির জন্য জ্ঞানার্জনের বিষয়টিরও একটি ব্যবহারিক লক্ষ্য থাকে। আর এ  লক্ষ্যও বাণিজ্য বিস্তার সম্পর্কিত। গুজরাটি শব্দ বেদীয় (vediyo) বলতে  বোঝায়— একজন মানুষ যিনি বেদ অধ্যয়ন করেন। এটা অনেক প্রাচীন একটি সংস্কৃত  টেক্সট (বেদ), যা সনাতন ধর্মের ভিত্তি রচনা করেছে। সংস্কৃত টেক্সটে বেদীয়  বলতে বোঝায়— পণ্ডিতমূর্খ (learned fool)। ইয়াংকি আমেরিকানরা তাদের  ব্যবহারিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সিলিকন ভ্যালির প্রায় এক-চতুর্থাংশ  স্টার্টআপের পুরোধা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তেমনি বাকি এক-চতুর্থাংশ  স্টার্টআপের পেছনে রয়েছেন গুজরাটিরা।

পুরো  বিশ্বে হীরার ব্যবসায় গুজরাটিদের বিশাল একটা প্রভাব রয়েছে। বিশ্বের ৯০  শতাংশ রাফ ডায়মন্ডের কাটাকাটি এবং পালিশ করা হয় গুজরাটি শহর সুরাটে, যা  বছরপ্রতি প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য। অন্যদিকে বেলজিয়ামের  অ্যান্টোয়ার্পের (Antwerp) ডায়মন্ড ইন্ডাস্ট্রির এক-তৃতীয়াংশও এখন ভারতীয়  তথা গুজরাটিদের দখলে। মোটেল মালিকদের মতো এ ডায়মন্ড প্রসেসরদের বেশির ভাগ  এসেছেন একটি বিশেষ কমিউনিটি থেকে, যারা নিজের পরিচয় দিতে গেলে খুঁজে ফেরেন  দক্ষিণ গুজরাটের একটি নিভৃতপল্লী পলানপুরকেই (Palanpur)।

অবাক  হওয়ার কথা নয়, বিশ্বের নানা স্থানে সাফল্যের মতো ভারতের সাম্প্রতিক  অর্থনীতিতেও তাদের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। ভারতের তিনজন সবচেয়ে ধনী  ব্যবসায়ীর মধ্যে মুকেশ আম্বানি (Mukesh Ambani), দিলীপ সাংঘবি (Dilip  Shanghvi) এবং আজিম প্রেমজি (Azim Premji) গুজরাটি। ভারতের মোট জনশক্তির ৫  শতাংশ হয়েও দেশের রফতানির ২০ শতাংশ আসছে তাদের থেকেই। ভারতের বৃহত্তম  বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্সের স্বত্বাধিকারীও একজন গুজরাটি।  ভারতের সিনথেটিক টেক্সটাইল সেক্টরের ওপর কর্তৃত্ব করে আহমেদাবাদ ও সুরাটের  শিল্পকেন্দ্র। বিশ্বের বৃহত্তম জিন্স পোশাকের মধ্যে অন্যতম ডিনিমের একটি  কারখানা রয়েছে আহমেদাবাদে, এখানে ভারতের অনেক ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্টেরও  বাস। এরা সবাই মিলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে একটা মোটা অঙ্কের রাজস্ব জমা করেন  প্রতি বছর। এর পথ ধরেই আরো অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে, যা ২০১৪ সালের  নির্বাচনে গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের  প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ করে দিয়েছে।

ভারতের  সমুদ্রসীমার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ গুজরাটে অবস্থিত, যা এখানকার অধিবাসীর বণিক  ও পর্যটক হওয়াকে অনিবার্য করে তুলেছে। এর ভৌগোলিক অবস্থানও পার্সিয়ান গালফ  থেকে শুরু করে আফ্রিকা অভিমুখী বাণিজ্য বিস্তারের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব  এশিয়ার দিকে বিস্তার ঘটানোর কাজটা অনেক সহজ করে দিয়েছে। দশ শতকের আগ থেকেই  বিভিন্ন আফ্রিকান ও গালফ অঞ্চলের সাহিত্যসূত্র থেকে গুজরাটি ব্যবসায়ীদের  সম্পর্কে জানা যায়। আরবদের সঙ্গেও তাদের শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপিত  হয়েছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। অন্যদিকে এ প্রদেশের আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো,  যা ১৯৬০ সালের দিকে স্থাপন করা হয়েছে; সেখানেও অনেক আরব প্রভাবের দেখা  মেলে। এখানে তিনটি প্রধান অঞ্চল রয়েছে, যার মধ্যে কুচের (Kutch) বেশির ভাগ  অংশই শুষ্ক বলে খুবই কম লোকের বাস। এ অঞ্চল এখন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী  সৌরাষ্ট্র, যা এর পশ্চিমাংশ নির্দেশ করে এবং মধ্য গুজরাট, এটি পূর্বাংশে  অবস্থিত। এখানে এর প্রধান শিল্প-কারখানাগুলো গড়ে উঠেছে। এর বাইরে গুজরাটে  গড়ে ওঠা মোহনীয় শিল্প উপকরণগুলো এখনো কুচের সাগরতীরে মান্দভিতে (Mandvi)  হাতে তৈরি করা হয়।

মুসলিম বণিকদের  প্রভাব এবং উত্তর দিক থেকে পার্সিয়ান বিজেতাদের আগমণে এখানকার অনেক হিন্দু  ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। তারা বর্তমানে বোহরা (Bohras), খোজা (Khojas) ও  মেমন (Memons) সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। এটা গুজরাটের বাণিজ্যিক  মূলমন্ত্র (commercial ethos) গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।  বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর হিন্দুদের কালাপানি (crossing the  sea) রীতি ভেঙে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার সুযোগ মেলে তাদের। তবে ১৯০৫ সালের দিকে  এসে ধর্মীয় নেতারা দুটি প্রধান হিন্দু বাণিজ্য সংস্থার ওপর থেকে সব ধরনের  সামাজিক বিধিনিষেধ উঠিয়ে নেন। একটি হিন্দু গ্রুপ পাতিদার (Patidars), যারা  পারিবারিক নাম হিসেবে পাতিল (Patel) ব্যবহার করেন, তাদের বেশির ভাগই প্রথম  দিকে ছিলেন কৃষক। তবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চাষের জমি ভাগবাটোয়ারা হয়ে  গিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা তামাকের মতো বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্যের ব্যবসায়  আত্মনিয়োগ করেন।

দ্য স্পিরিট অব ক্যাপিটালিজম

ভৌগোলিক  সুবিধা এবং ধর্মীয় গুণাবলির পাশাপাশি গুজরাটে মার্কেন্টালিজম তথা বণিকবাদ  বিকাশে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল তা হচ্ছে, ইউরোপীয় গিল্ডের  আদলে গড়ে ওঠা সেখানকার মহাজন। খ্রিস্টীয় ১৬ শতক তথা মোগল যুগের প্রথম দিক  থেকে এই মহাজন শ্রেণী গড়ে উঠেছিল। তারা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত এবং কাপড় বা  শস্য বিক্রেতাদের মধ্যকার বিরোধ নিরসন করত। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে  সমাজবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক এসপি হিন্দুজা মনে করেন, মহাজনরা সেলফ রেগুলেশন  তথা আত্মনিয়ন্ত্রণের একটা পদ্ধতি বের করেছিলেন, তবে তারা ছিলেন বিভিন্ন  জাতিসত্তা ও ধর্মের প্রতিনিধিত্বকারী; যার মধ্যে রয়েছে মুসলিম, হিন্দু, জৈন  এবং অন্যসব সম্প্রদায়। সবাইকে তারা একটি বাণিজ্যিক শ্রেণীতে একত্রিত  করেছিলেন।

যেখানে একটি ধর্ম  প্রটেস্ট্যান্টবাদ ইউরোপের অ্যাংলো-স্যাক্সন পুঁজিবাদ বিকাশের পথ করে দেয়।  সেখানে গুজরাটি ক্যাপিটালিজম অনেকগুলো প্রভাবের ফিউশনে তৈরি হয়েছিল। সেখানে  জাতিসত্তা ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য একটা শক্তিমত্তা হিসেবে কাজ করেছিল, যা  ট্রেডিং নেটওয়ার্ককে আরো বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। ইউনিভার্সিটি অব  লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের এডওয়ার্ড সিম্পসন  মনে করেন, পরিচিতি নিয়ে এক ধরনের বাস্তবধর্মিতা ও নমনীয়তার পাশাপাশি  বাণিজ্য বিস্তারের অদম্য ইচ্ছাই তাদের পথ দেখিয়েছে, যেখানে মহাজনদের ভূমিকা  ছিল চোখে পড়ার মতো। গুজরাটিরা অনেক গর্বের সঙ্গে তাদের আত্মপরিচয় ধরে  রেখেছে, যেখানে তারা কাজের প্রয়োজনে ব্রিটিশ, উগান্ডান কিংবা ফিজিয়ান  হয়েছে; যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও একটা সম্পদ।

১০-১১  শতকের দিকে তারা ব্যবসায় একটা স্বতন্ত্রনীতি প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে  ধর্ম একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে জৈন। জৈন মতবাদ  ব্রাহ্মণ্যবাদ ও সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ ছিল বলে  মনে করেন হিন্দুজা, যেমনটা খ্রিষ্টধর্মের মধ্যে ছিল প্রটেস্ট্যানবাদ।  জৈনরা শাকাহারী এবং শান্তিবাদী। চাষ করতে গেলে মাঠের বিভিন্ন প্রাণীকে  ক্ষতির সম্মুখীন করতে হয়, বিশেষ করে বিভিন্ন পতঙ্গ, যারা মাঠের আশপাশে  ঘোরাঘুরি করে। তারা ছিল এর বিরুদ্ধে। তাই তাদের পক্ষে বাণিজ্য বিস্তার বাদে  তেমন কোনো পথ খোলা ছিল না।

জৈন  অনুশীলন বাণিজ্য বিস্তারের পথ করে দেয়, যেখানে অসহিংস এবং সততানির্ভর  চিন্তাই হয়ে ওঠে ব্যবসার মূলমন্ত্র। এমনি একজন জৈন ব্যবসায়ী  হেমচন্দ্রাচার্য মনে করেন, যেহেতু ব্যবসার জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আবশ্যক,  সেহেতু ব্যবসায়ীরা কারো সঙ্গে শত্রুতা ও সংঘর্ষে জড়াবেন না। অন্যদিকে এক  ধরনের অনড়ম্বর জীবনযাপনও গুজরাটি চরিত্রের অন্যতম। এ অঞ্চলের রাজনীতিবিদ  মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, যিনি পাকিস্তানের স্থপতি  এবং সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদি বিশ্বব্যাপী পরিচিত, তবে সেখানকার উদ্যোক্তারা  এখনো রয়ে গেছেন পর্দার আড়ালেই; যা তাদের অর্থনৈতিক বিকাশের অন্যতম কারণ,  তারা এটা পছন্দও করে।

বিশ্বাস ও সততা  এখনো গুজরাটি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে গুরুত্ব পায়। পলানপুরের একজন  জৈন ব্যবসায়ী মেহতার হীরার কোম্পানি প্রতি বছর ১.৫ বিলিয়ন ডলার টার্নওভার  করে। পাশাপাশি টোকিও থেকে অ্যান্টিওয়ার্প— নানা স্থানে তাদের ব্যবসা  বিস্তৃত হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসার আকার কোনো বিষয় নয়, এখনো তারা টিকে আছেন  কথার মূল্যের ওপর। পুরো সিস্টেম কীভাবে কাজ করে, তা বোঝাতে গিয়ে তিনি  বলেছেন, হীরার ব্যবসায়ীরা তাদের সঙ্গেই কাজ করেন; যাদের ওপর তাদের আস্থা  রয়েছে। গুজরাটের একশ্রেণীর মানুষ যেমন পাতিল এবং পলানপুরের জৈনরা এক্ষেত্রে  অগ্রগণ্য; যারা একটি বিশেষ ব্যবসাতেই একত্র হয়েছেন। বলতে গেলে এভাবেই  গুজরাটি বড় বড় ব্যবসাগুলো পরিচালিত হচ্ছে কোনো না কোনো পরিবারের  নিয়ন্ত্রণে।

ঐতিহ্যগতভাবে একটি ব্যবসা  শুরুর ক্ষেত্রে ব্যবসার মূলধন আসে পরিবার থেকেই, বড়জোর সম্প্রদায়ের মধ্য  থেকে। এর অন্য সুবিধাও রয়েছে; যেমন সুরাট ডায়মন্ড অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান  দীনেশ নবেদ্য মনে করেন, ‘আমাদের সরকারের সঙ্গে খুব বেশি কাজ করতে হয় না এবং  পরিবার থেকেই বেশির ভাগ ব্যবসায়ের মূলধন আসে বলে ব্যাংকের সঙ্গেও ব্যবসা  নিয়ে তেমন কোনো সম্পর্ক রাখতে হয় না।’ সুতরাং সেখানে দুর্নীতির সুযোগ খুব  একটা থাকে না বললেই চলে।

ব্যবসায়ের  ব্যর্থতাও একটা বড় পরিসরে পারিবারিক পর্যায়েই সামলানো হয়। গুজরাটি  উদ্যোক্তারা এজন্যই রিস্ক টেকার তথা ঝুঁকি নিতে অভ্যস্ত। কিন্তু তারা, যারা  তাদের ফ্যামিলি নেটওয়ার্ক, তাদের জন্য একটা নিরাপত্তার জাল বিস্তার করে  রেখেছেন। তবে ব্যবসায় ব্যর্থতার যে পাংশুটে দাগ একবার তাদের ওপর পড়ে, বিশেষ  করে নিজের কোনো ত্রুটির কারণে কেউ যদি ব্যবসায় ব্যর্থ হয়, তার থেকে বেরিয়ে  আসার জন্যও অনেক সংগ্রাম করতে হয়। মেহতা অনেক মানুষের জামিনে সহায়তা  করেছেন। তিনি দেখেছেন, দেউলিয়া হয়ে কীভাবে মানুষ তার সর্বস্ব হারাচ্ছে।  তিনি বিষয়টিকে নিন্দনীয় মনে করেন।

খুচরা বাণিজ্যের সাম্রাজ্য

গুজরাটের  দুজন ইতিহাসবিদ অচ্যুত ইয়াগ্নিক এবং সুচিত্র শেঠ লিখেছেন, সুষ্ঠু বাণিজ্য ও  সত্ ডিলিং-নির্ভর নীতিবান বাণিজ্যিক অনুশীলনের কারণেই গুজরাটি ব্যবসায়ীরা  বিশ্বাসযোগ্যতা ও খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাই যখন দলে দলে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও  ব্রিটিশ বণিক ভারতবর্ষের মাটিতে পা রাখে, তখন তারা গুজরাটিদের ব্যবসায়িক  অংশীদার বানায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সদর দফতরও ছিল সুরাটে। এটা  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গুজরাটিদের সম্পর্কের ছোট্ট একটা প্রমাণ। এর  পর ইংরেজ শাসনামলে সমসাময়িক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের আকৃতিদানে এটাও কার্যকর  ভূমিকা পালন করেছিল।

তারা ইউনিয়নের  পতাকা অনুসরণ করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিটি কোনায় পা রেখেছিল, যা  বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ নীতির সফলতাও বটে; যেখানে গুজরাটি ব্যবসায়ীরা বিশ্বের  নানা স্থানে দোকান স্থাপন করে। শত সহস্র গুজরাটি অভিবাসী তখন আফ্রিকার  দক্ষিণাংশ থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া, বার্মা, সিঙ্গাপুরসহ আরো অনেক অঞ্চলের  পাশাপাশি ফিজির মতো অখ্যাত এলাকায়ও পাড়ি জমায়। ফলে যখনই দেখা গেছে  সাময়িকভাবে কোনো ঔপনিবেশিক কর্তা কোনো স্থানে রানী ভিক্টোরিয়ার ঝাণ্ডা নিয়ে  গেছেন, তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে গুজরাটিরাই। এদের মধ্যে আফ্রিকার জাঞ্জিবার  দ্বীপের কনসাল হেনরি বার্টেল ফ্রেরির কথা বলা যায়। তার মতে, ‘যেখানেই  ব্যবসা দেখেছি, সেখানেই রয়েছে গুজরাটিদের একচ্ছত্র আধিপত্য, তারা সবখানে  নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। তা একটা ছোট দোকানের মাধ্যমেই হোক আর বিশাল  মার্কেন্টাইল হাউজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই হোক। আমার জানামতে, স্কর্টিয়া থেকে  শুরু করে কেপ কলোনি পর্যন্ত বিশাল এলাকায় তাদের বিস্তৃতি সত্যি  আগ্রহোদ্দীপক। এটা প্রায় ৪০ বছর ধরে বলে আসছে এবং এখানে আসার আগে তাদের  অস্তিত্বের পরিধি আমার ধারণাতীত ছিল।’

এটাই  একমাত্র কারণ নয় যে, বেশির ভাগ গুজরাটি শুধু বাণিজ্যের প্রলোভনে দেশ  ছেড়েছে। তাদের বেশির ভাগই মাতৃভূমি ত্যাগ করেছে হতাশা থেকে, বিভিন্ন ধরনের  দুর্ভিক্ষ, প্লেগ ও কলেরার আতঙ্কও কাজ করেছে অনেকের মধ্যে। কিন্তু সুগার  প্লান্টেশন থেকে শুরু করে রেলপথ নির্মাণের কাজ— যেজন্যই হোক না কেন,  ভারতীয়রা বিশ্বের যেখানেই পা রেখেছে, সেখানেই আল্লিদিনা বিশ্রামের মতো  পূর্ব আফ্রিকার দোকানদার গুজরাটিকে পেয়েছে; যারা নিজেদের দোকানগুলো  ভারতীয়দের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এদিক থেকে চিন্তা করলে ব্যবসায়  উদ্বুদ্ধ এথনিক-ইন্ডিয়ান উগান্ডান, যাদের তিন-চতুর্থাংশ গুজরাটি, তারাই  সফলতার শীর্ষে ছিল। বিশ শতকের মধ্যভাগে এসে দেখা যায়, তারাই উগান্ডার  জিডিপিতে এক-পঞ্চমাংশ অবদান রাখছে এবং উগান্ডার আট মিলিয়ন জনসংখ্যায় তাদের  অবস্থান ছিল এক লাখের মতো। এদের মধ্যে একজন ছিলেন সংগীতশিল্পী ফ্রেডি  মার্কারি, যিনি ১৯৪৬ সালে জাঞ্জিবারে জন্ম নিয়েছিলেন।

তাউবাদের চেয়ে থ্যাচারিজমে বেশি আগ্রহ

ব্রিটিশ  সাম্রাজ্যের অন্য উপনিবেশগুলোতেও গুজরাটিদের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। যেখানে  উদাহরণ হিসেবে কেনিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার কথা বলা যায়। বিশেষ করে  মেমনরা গিয়েছিল বার্মায়, যারা সেগুন কাঠের পাশাপাশি চাল ও চায়ের ব্যবসা  করত। এদের মধ্যে সবচেয়ে সফল হিসেবে স্যার আবদুল করিম জামালের কথা বলা যায়,  যিনি ১৯২০ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে নাইট খেতাব পেয়েছিলেন। তিনি  ছিলেন কাথিয়ার জামনগরের কিং অব রাইস, যার নামে রেঙ্গুন তথা ইয়াঙ্গুনে একটি  রাস্তা পর্যন্ত হয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য গুজরাটিরা কী করেছে, তার  প্রমাণ হিসেবে বলা যেতে পারে— এখন এ কোম্পানির মালিকই বনে গেছেন পলানপুরের  এক জৈন ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা। তিনি ২০০৫ সালের দিকে মরিবন্ড কোম্পানির  মালিকানা লাভ করেন। পরে এর একটি শাখা খোলেন লন্ডনের পশ্চিমাংশে। এখানে  সুন্দর ক্রোকারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফলের জ্যাম ও জেলি এবং চা বিক্রি  করা হয়। ধীরে ধীরে দোকানটি ছেয়ে যায় আরো বিস্তৃত এলাকায় এবং এর ব্যাপ্তি  এতটাই হয়েছিল যে, তাকে তখনকার যুগের গুগল বললে ভুল হবে না। বলতে গেলে  বিশ্বের প্রথম জয়েন্ট স্টক কোম্পানির সফল অবতারণা হয়েছিল এর মধ্য দিয়েই।  ব্রিটিশদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে তাদের সাম্রাজ্য থেকে সুবিধা নিতে পেরেছিল  গুজরাটিরা, যার সুফল পায় শেষ পর্যন্ত। এর পথ ধরেই তারা অনেকটা উপনিবেশের  আদলে ঠাঁই করে নেয় বার্মা, উগান্ডার মতো বিশ্বের নানা স্থানে। ফলে  ব্রিটিশরা যখনই সেসব দেশ ছেড়ে গেছে, তখন তাদের মিত্র হিসেবে স্থানীয়  স্বাধীনতা উত্তরকালের রাজনীতিবিদদের টার্গেটে পরিণত হয় তারাই।

১৯৬২  সালের দিকে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ক্ষমতা দখলের পর সেখান থেকে সব বিদেশী  ব্যবসায়ীকে বের করে দেয়া হয়, যাদের মধ্যে অনেক ভারতীয়ও ছিল। একইভাবে ১৯৭২  সালে স্বৈরতান্ত্রিক শাসক ইদি আমিন ক্ষমতা গ্রহণ করে প্রায় ৬০ হাজার এশীয়কে  ৯০ দিনের মধ্যে দেশ ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যাদের বেশির ভাগ ছিল  গুজরাটি। ফলে তাদের ব্যবসায় এক ধরনের ধস নামে। এর পর ইদি আমিনের অন্তরঙ্গ  বন্ধুরা গুজরাটিদের ব্যবসা দখলে নিয়ে সেগুলো নিজেদের মতো করে চালাতে গিয়ে  ব্যর্থ হয়। ১৯৯৭ সালের দিকে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে দেশ গড়ার  জন্য ইয়োবেরি মুসেবেনি ব্রিটেন গিয়ে সেখান থেকে বের করে দেয়া বিদেশীদের  আবার দেশে ফিরিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করেন। তবে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন জেনারেলরা  কখনো এ ধরনের চিন্তা করেননি। ফলে তাদেরকে এখনো এর মূল্য দিতে হচ্ছে।

উগান্ডা  থেকে কপর্দকশূন্য হয়ে গুজরাটি শরণার্থীরা ব্রিটেনে পা রাখে। এতে উগান্ডার  ক্ষতি হলেও উপকৃত হয়েছিল ইংরেজরা। তাদের বেশির ভাগ ব্যবসা ইদি আমিন দখলে  নেয়ার পর প্রায় ২৭ হাজার গুজরাটি শরণার্থীর ঠাঁই হয় ব্রিটেনে। সেখানে গিয়ে  তারা দ্বিতীয় দফায় নিজেদের ভাগ্য গড়ার চেষ্টা করে, যেটা পুরোপুরি উপকারে  আসে ব্রিটিশদের। ১৯৭১ সালের দিকে ১৭ বছর বয়সী ভাগ্যান্বেষী যুবক ডলার পোপট  পকেটে মাত্র ১০ পাউন্ড নিয়ে পা রেখেছিলেন ইংল্যান্ডের মাটিতে। তিনি এর থেকে  ৬ পাউন্ড খরচ করে ফেলেন একটি আইরিশ পরিবারের সঙ্গে কিলবার্নে লজিং থাকতে  গিয়ে। প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ২৫ পেনি বেতনে একটি হোটেলে ওয়েটারের চাকরি  নিয়েছিলেন। তিনি সেখানে শুধু কাজই করেননি, পাশাপাশি অনেক গুজরাটির জন্য  চাকরির সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

যে সময়  উগান্ডা থেকে এশীয় শরণার্থীরা আসতে শুরু করে, ঠিক সে সময়ে পোপট উইম্বলিতে  একটা তিন বেডরুমের বাসা কিনেছিলেন। সেখানে প্রায় ২৫ জন শরণার্থীর জায়গা  দেয়া সম্ভব হয়। এর পর তিনি বাণিজ্য শিক্ষায় নৈশকালীন কোর্সে ভর্তি হন।  পাশাপাশি অ্যাকাউন্টিংয়ের একটি কোর্স শেষ করে নিজে একটি ছোট দোকান খোলার  পাশাপাশি সাব-পোস্ট অফিস নেন; যা তাকে আয়ের সুযোগ করে দেয়। এর পর মর্টগেজ  দাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি ফিন্যান্স কোম্পানির পত্তন করেন তিনি। ধীরে  ধীরে তিনি একটি কেয়ার হোম, হোটেলসহ আরো অনেক বিষয়-সম্পত্তির মালিকানা অর্জন  করেন।

এখন প্রায় ৭০ মিলিয়ন পাউন্ডের  মালিক তিনি। ২০১০ সালের রক্ষণশীল সরকারের কাছ থেকেও অনেক সম্মান অর্জন  করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হয়ে  উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে কঠোর শ্রম দিয়েছি, শিক্ষালাভ করেছি, পাশাপাশি গড়ে  তুলেছি নিজস্ব ব্যবসায়িক সত্তা। এক্ষেত্রে অনেক রক্ষণশীল, যারা ব্রিটেনে  উগান্ডান-এশিয়ানদের ঠাঁই দেয়ার বিরোধিতা করেছিলেন, তারাও আজ লর্ড পোপটের  মতো ব্যক্তিদের সমাদর করতে বাধ্য। কারণ ব্রিটেনের অর্থনীতিকে তিনি যা  দিয়েছেন, তা আজ পুরোপুরি বাস্তব। নর্মান টেবিট, যিনি মার্গারেট থ্যাচার  সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন; ২০১২ সালের দিকে লর্ড পোপটকে  লিখেছেন, ১৯৭২ সালের দিকে উগান্ডা থেকে গুজরাটিদের ব্রিটেন প্রবেশে তিনি  বাধা দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন স্বীকার করছেন তাদের অবদানের কথা। তারা এখানে  আসার ফলে ব্রিটিশ মূল্যবোধ আরো সমুন্নত হয়েছে এবং কমিউনিটির অংশ হিসেবে এরা  সম্মানের দিক থেকে কোনো অংশেই নিচে নয়।

বিশ্বের  নানা স্থানে থাকা গুজরাটিরা কি ভবিষ্যতেও এমন সফলতার মুখ দেখবে? ২০০২  সালের দিকে সেখানে বসবাসরত মুসলিম ও হিন্দুদের দ্বন্দ্ব তাদের হাজার বছরের  ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে চিড় ধরিয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে তাদের বাণিজ্যের  মূলমন্ত্র গড়ে উঠেছিল। এক্ষেত্রে এক ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, যা সময়ের আবর্তে  তাদের মধ্যে বড় ধরনের হতাশার জন্ম দিতে পারে। ভয় আরো রয়েছে, যেখানে তাদের  অর্থনীতিনির্ভর জ্ঞানার্জন তথা উপযোগিতাবাদী শিক্ষা ভবিষ্যতে ক্ষতির কারণ  হয়ে দেখা দিতে পারে; যার সূত্র ধরে এখন বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদে ভারতের  বেশির ভাগ হাইটেক ব্যবসা হচ্ছে। কিন্তু গুজরাটিরা বলতে ভালোবাসে যে, তারা  ব্যবসা করে, প্রযুক্তি নয়। গত শতকের বাজারে যদি কোনো শূন্যতা থেকে থাকে,  সেগুলো ঠিকমতো ধরতে পেরেছিল গুজরাটিরা। সুতরাং ভবিষ্যতের বাজারে যদি কোনো  ধরনের শূন্যতা বের হয়, তবে সেখানেও গুজরাটিরা তাদের স্থান করে নিতে পারবে  বলেই বিশ্বাস।

ইকোনোমিস্ট থেকে অনূদিত।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s