আটলান্টিক থেকে এড্রিয়াটিক সিরিজ (১-৬)


(পর্ব ০১ )
এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ
শুরুটা করতে হয় বনিকে দিয়েই। কাগজপত্রে ও সাজিদ বিন দোজা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। অসাধারণ প্রতিভা এ তরুণ শিক্ষক ও স্থপতির। স্থাপত্যকলার এ মেধাবী ছাত্রটি আমার চোখে একজন অসাধারণ চিত্রশিল্পী। বাংলার প্রচীন, মধ্য ও ঔপনিবেশিক যুগপর্বের স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন স্কেচ নিয়ে ওর একক চিত্র প্রদর্শনীও হয়েছে। অনেক বছর আগে অমন একটি প্রদর্শনী হয়েছিল ঢাকায় আলিয়াঁস ফ্রাঁসেসে। আমি আর প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট অধ্যাপক রফিকুন নবী (রনবি) এর দ্বরোদ্ঘাটন করেছিলাম। এ বনি পিএইচডি গবেষণা করছিল পর্তুগালের এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। থিসিস জমা দিয়েছে। এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথামতো জুরি বোর্ডে একজন বিদেশী অধ্যাপক থাকবেন। কয়েকটি দেশের অধ্যাপকদের জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে ওরা সভা করেছে। একদিন বনি জানাল, এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ আমাকে আমন্ত্রণ জানাবে।
গত বছর ডিসেম্বরের দিকে এভোরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার সম্মতি পাওয়ার জন্য ই-মেইল করল। জানাল, আমার সুবিধাজনক সময়ে ওরা তারিখ চূড়ান্ত করবে। আমার দেয়া তারিখ মতো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২৭ এপ্রিল (২০১৬) জুরি বোর্ড বসার তারিখ স্থির করল। একইসঙ্গে ওদের অনুরোধ ছিল, ২৮ এপ্রিল আমি যেন এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ইউরোপীয়দের আগমন বিষয়ে বক্তৃতা করি। ওদের একাডেমিক কাজ খুব গোছানো। দিন কয়েকের মধ্যেই বনির থিসিসের সফট কপি ইন্টারনেটের মাধ্যমে পেয়ে গেলাম। এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণপত্রসহ সব ধরনের কাগজপত্র যথাসময়ে চলে আসায় ভিসা পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। এমিরাটস এয়ারলাইন্সের বিমান টিকিটও এসে গেল। ২৫ এপ্রিল সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-দুবাই ফ্লাইট যাত্রা শুরু করে। স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া ১টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল সোয়া ৩টা) দুবাইয়ে অবতরণ করে বিমান। এমিরাটসের আরেকটি বিমান প্রস্তুত ছিল। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৪০মিনিটে আমাদের নিয়ে পর্তুগালের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে এমিরাটসের সুপরিসর বিমানটি। এ বিমানে ক্লান্ত হওয়ার অবকাশ নেই। আতিথেয়তার ছড়াছড়ি। বাড়াবাড়িও বলা যায়। আছে প্রত্যেক সিটের সঙ্গে মনিটর। নিজের পছন্দমতো ছবি, গান বা খেলা দেখা। আর আছে নেভিগেশনের সুবিধা। চমৎকারভাবে বিমান যাত্রার রুট ও যাত্রাপথ দেখার ব্যবস্থা ছিল। আমি এখানেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। এ সুযোগে ভূগোলটাও ঝালাই করে নেয়া গেল।
পর্ব (০২)

লিসবনে অবতরণ
বিমান থেকে ভূগোল অর্থাৎ মানচিত্র মিলিয়ে শনাক্ত করতে পারছিলাম, আমরা মধ্যপ্রাচ্য অতিক্রম করছি। কুয়েত, বাহরাইন, বসরা, বাগদাদ, জেদ্দা, মদিনা হয়ে আমরা অতিক্রম করলাম সুয়েজ খাল, নীল নদ, মিসরসহ উত্তর আফ্রিকা। এরপর আমাদের বিমান এলো ইউরোপের আকাশে। একসময় পাড়ি দিলাম আইওনীয় সাগর, দক্ষিণ গ্রিস ও রোমের কাছাকাছি অঞ্চল। বাংলাদেশ থেকে আসতে এমিরাটসের দুবাই ফ্লাইটে একবার মধ্যাহ্নভোজ দিয়েছিল। এবার পর্তুগাল ফ্লাইট মধ্যাহ্নভোজ সরবরাহ করল। অভিন্ন যাত্রী হওয়ায় আমি এবারও পরখ করার জন্য মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণ করলাম। লক্ষ্য করেছি, আগের ফ্লাইটে ভারতীয় মাটন বিরিয়ানি পাওয়া গেছে। এবার পুরো ইউরোপীয় ডিশ। এর মধ্যে ছিল সেদ্ধ মুরগির একটি টুকরো। আলু সেদ্ধ, কয়েকটি সেদ্ধ বিন, আখরোটসহ সালাদ, এক টুকরো রুটি, মেয়োনেস, চকলেট, বিয়ার ইত্যাদি। একসময় আমাদের বিমান ভূমধ্যসাগরের ওপর চলে এলো। দুই-তৃতীয়াংশ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে ম্যাপ দেখাল আমাদের যাত্রা পথে এখন পরপর তিনটি শহর আছে- বার্সেলোনা, মাদ্রিদ ও লিসবন।
৮টার কিছু পরে লিসবনে অবতরণ করার কথা। বাংলাদেশ হলে বলতাম রাত ৮টা। বাংলাদেশের সঙ্গে ৫ ঘণ্টা সময়ের হেরফের আছে পর্তুগালের। তাই বলা ভালো, অপরাহ্ন ৮টা। আটলান্টিক মহাসাগরের পাশে মোহনার নদী তাগো (ঞধমঁং)-এর তীর ঘেঁষে দাঁড়ানো রঙিন ছবির মতো শহর লিসবন। তাগো নদীকে অনেকে বলেন তেজো নদী। রৌদ্রকরোজ্জ্বল শহর বলে লিসবনের পরিচিতি আছে। খানিক বাদেই এর প্রমাণ পাওয়ার অপেক্ষা। বিমানের সাউন্ডবক্স চালু হল। ক্যাপ্টেন জানালেন, কিছুক্ষণ পরই আমরা লিসবনে অবতরণ করব। স্থানীয় সময় তখন ৮টা। ৯টায় সন্ধ্যা লাগে। তাই বলে গোধূলিলগ্ন নয়। বিকালের ঝলমলে রোদ। বিমান নিচের দিকে নেমে আসছে। আটলান্টিক মহাসাগর দেখা যাচ্ছে। মোহনা থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রশস্ত তাগো নদী। দৃশ্যমান হচ্ছে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ঘরবাড়ি। সব বাড়ির গঠন যেন অভিন্ন। দোচালা চৌচালা লাল টালির ছাদ। রোদের আলোতে ঝলমল করছে। তাগো নদীতে ভাসছে ছোট বড় জাহাজ আর অনেক ত্রিকোণ পালতোলা নৌকো।
দীর্ঘ প্রায় ১২ ঘণ্টা বিমান যাত্রা শেষে ৮টার কিছু পরে লিসবন বিমানবন্দরে অবতরণ করল এমিরাটস এয়ারলাইন্সের সুপরিসর বিমানটি। দুবাইয়ে একঘণ্টা যাত্রাবিরতি ছাড়া একটানা বিমানভ্রমণ। তাই মাথাটা একটু ঝিম ঝিম করছিল। বাইরে তাকিয়ে বুঝলাম দিনের আলো ফুরোতে এখনও কিছুটা সময় বাকি।
পর্ব ০৩
লিসবন বিমানবন্দরে
কথা ছিল বিমানবন্দরে আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে আসবেন এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মি. কার্লোস। অধ্যাপক কার্লোসের ছবি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমার ছবিও পেয়ে গেছেন তিনি। আশা করি চেনাচেনিতে কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু বিমানবন্দরের নির্ধারিত লাউঞ্জে এসে অভ্যর্থনা জানানো মানুষের ভিড়ে কার্লোস চেহারার কাউকে পেলাম না। কিছুটা চিন্তিত হয়ে যখন দৃষ্টি ঘোরাচ্ছি, তখন হঠাৎ সহাস্য মুখে আমার সামনে এসে দাঁড়াল বনি। অধ্যাপক কার্লোসের না আসতে পারার কারণটি ওর কাছ থেকে জানলাম। কার্লোসের স্ত্রী লিসবনের বিখ্যাত আলাকচিত্রী। তিনি দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়েছেন। তাই কার্লোসকে স্ত্রীর পাশে থাকতে হয়েছে। তার অনুরোধেই বনিকে আসতে হয়েছে বিমানবন্দরে। ফলে এভোরা থেকে দেড় ঘণ্টা বাস জার্নি করে বনি বিকালের মধ্যেই চলে এসেছে লিসবন।
লিসবনকে স্থানীয় মানুষ উচ্চারণ করে ‘লিসবোয়া’। বিমানবন্দরে কিছুক্ষণ থাকতে গিয়ে বুঝলাম এখানকার অধিবাসীরা পর্তুগিজ ভাষা ছাড়া কথা বলে না। বিমানবন্দরে ইংরেজি নিয়ে কোনো সমস্যা না হলেও পরে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছাড়া রাস্তাঘাট, দোকানপাট সর্বত্র বেশিরভাগ মানুষ ইংরেজি বলে না, বোঝেও না। জনসংখ্যা ভীষণ কম। প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের এ রাজধানী শহরের লোকসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখের মতো।
লিসবনে নবোপলীয় যুগের মানববসতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। আবিষ্কৃত হয়েছে মেগালিথিক সংস্কৃতির প্রত্নবস্তু। পরে কেল্টিক গোত্রের মানুষ খ্রিস্টপূর্ব যুগে বসবাস করেছে এখানে। এ ইন্দো-ইউরোপীয় কেল্টিকরাই পর্তুগালের আদি অধিবাসী।
পিউনিক যুদ্ধের পর অগাস্টাস সিজারের সময়ে রোমান আক্রমণকারীরা লিসবনের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ৪০৯ থেকে ৪২৯ খ্রিস্টাব্দে রোমের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এখানে। এ আধিপত্য টিকে ছিল ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। লিসবন ও এর আশপাশে এখনও অনেক রোমান স্থাপত্য টিকে আছে। এরপর রোমান সভ্যতার পতনের যুগে জার্মানির উপজাতি ভিসিগথদের অধিকারে চলে আসে লিসবন। এ বর্বর আক্রমণকারীদের হাতে দেড় শতাধিক বছর অতিবাহিত করে লিসবন। এরপর মধ্যযুগে মুসলিম আক্রমণকারীরা লিসবনে অভিযান পরিচালনা করে। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে লিসবন মুসলমানদের অধিকারে চলে আসে। এ সময় এখানে অনেক মসজিদ ও প্রাসাদ নির্মিত হয়। এখনও লিসবন এবং এর চারপাশের শহরে মুসলিম স্থাপত্য ও শিল্পকলার খোঁজ পাওয়া যায়।
আধুনিক লিসবনের যাত্রা শুরু হয় পনের থেকে সতের শতকে ভৌগোলিক আবিষ্কারের সময় থেকে। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দ্য-গামার ভারত আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল।
পর্ব (০৪-০৫)
লিসবন থেকে এভোরা
বনির সঙ্গে বিমানবন্দরের বাইরে এলাম। ততক্ষণে দিনের আলোর আর অবশিষ্ট নেই। সন্ধ্যা অতিক্রান্ত হয়ে রাতের দিকে ছুটছে সময়। ঘড়িতে সাড়ে ৯টা বেজে গেছে। কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। বাসস্ট্যান্ড মূল শহরের একপ্রান্তে। এমনিতেই লোকসংখ্যা কম। আরও সুনসান হয়ে গেছে। দিনের আলো অনেকক্ষণ থাকলেও ঘড়ির ১০টা রাত ১০টার মতোই ওদের। কারণ ভোর ৬টার মধ্যে দিনের আলো ফুটে যায়। এ কারণেই আমাদের হিসাবের সন্ধ্যায় অর্থাৎ পর্তুগালের রাত ৯টা-১০টায় এখানকার মানুষ সাধারণত ডিনার সেরে ফেলে। এ বাস্তবতায় রাস্তায় লোক চলাচল কমে যেতে থাকে।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমরা বাস টার্মিনালে এলাম। এখানেও যাত্রী নেই বললেই চলে। এভোরাগামী বাস ছাড়বে রাত ১০টায়। আমরা টিকিট কেটে অপেক্ষা করলাম। টার্মিনালে তিনটি বাস প্রস্তুত ছিল। এর কোনো একটা হয়তো এভোরা যাবে। পুরো ইউরোপেই বাসগুলো দেখার মতো। ঝকঝকে তকতকে। একটি আঁচড় পর্যন্ত নেই বাসের গায়ে।
এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ পেয়ে একটি বাড়তি আনন্দ ছিল আমার। এভোরা সম্বন্ধে পুঁথিগত বিদ্যা আমাকে শহরটির ব্যাপারে বিশেষ কৌতূহলী করে তুলেছিল। এটি পর্তুগালের অন্যতম পর্যটন শহর। রাজধানী লিসবন থেকে এর দূরত্ব সড়কপথে ১৪০ কিলোমিটার। নিয়ন্ত্রিত গতিতে বাস দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে দেয়। সমুদ্র ও নদী সান্নিধ্য থেকে অনেকটা দূরে এর অবস্থান। এভোরা স্থানীয় মানুষের উচ্চারণে ‘ইভুরে’। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই কেল্টিকদের বসতি ছিল এখানে। কেল্টিকদের উচ্চারণে বলা হতো ‘ইবুরা’। এভোরা এখন পর্তুগালের একটি জেলা শহর। প্রায় ১৫০ কিলোমিটারের এ শহরটির লোকসংখ্যা সাড়ে ছাপ্পান্ন হাজারের মতো। ৫৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট অগাস্টাস সিজারের সময় রোমানরা এভোরা দখল করে নেয়। চার শতকে বিশপ কুইন্টিয়ানাসের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে শহরটি। বর্বর অভিযানের যুগে ভিসিগথদের হাতে এভোরা অধিকৃত হয়। তখন থেকে এভোরা পরিচিত হয় গির্জা নগরী হিসেবে। মুসলমান সেনাপতি তারিক বিন যায়িদ এভোরা দখল করে নেন ৭১২ খ্রিস্টাব্দে। এ সময় থেকে মুসলমানরা আরবি উচ্চারণে এভোরাকে বলত ‘ইয়াবুরাহ’। মুসলমানরা এখানে কৃষি সভ্যতার বিকাশ ঘটায়। মসজিদ ও দুর্গ নির্মাণ করে। ১১৬৫ খ্রিস্টাব্দে এভোরা থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করেন জিরাল্ড দ্য ফিয়ারলেস। পরের বছর অর্থাৎ ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আফনসো এখানকার শাসনভার গ্রহণ করেন।
রাত পৌনে ১০টায় আমাদের নির্দিষ্ট বাসটি টার্মিনালে এসে দাঁড়াল। বনিকে নিয়ে জানালার পাশে বসলাম। কাটায় কাটায় ১০টায় বাস ছেড়ে দিল। বাসের দুই-তৃতীয়াংশ আসনই ফাঁকা। পথে আরও দু-তিনটি স্টপেজ আছে, ওখান থেকে কিছু যাত্রী উঠতে পারে। টার্মিনাল পার হতেই বুঝতে পারলাম শহর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বাস। এমনিতেই পথেঘাটে লোকজন তেমন নেই, এখন আরও সুনসান হয়ে গেল। দু’পাশেই আলো-আঁধারিতে মাঝে মাঝে অনুচ্চ পাহাড় চোখে পড়ল। আমাদের ডানপাশে সম্ভবত দক্ষিণ-পশ্চিম দিক হবে পাহাড়ের ধাপে ধাপে এবং পাদদেশে ঘরবাড়ি চোখে পড়ছে। বাঁ দিকটা বিরান। গাছপালা ঝোপঝাড়। বোঝা যাচ্ছিল ডানপাশে পাহাড়ের বিপরীত দিক দিয়ে তাগো নদী বয়ে যাচ্ছে। পরে আমরা নদীর একটি ধারার ওপর দিয়ে ব্রিজ পার হয়েছি। বনি জানাল, কিছু পরেই ডানপাশে বাড়িঘর ছাপিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় মধ্যযুগের একটি দুর্গ দেখতে পাবেন। ওর কথা শেষ না হতেই দৃষ্টিসীমায় দুর্গ ধরা দিল। নিঝুম নিরালায় অনেকটা জায়গাজুড়ে দুর্গটি দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকটি বাতি জ্বলছে তাই দুর্গের অবয়ব বোঝা যাচ্ছিল। বইপত্রে অনেক দেখা মধ্যযুগের দুর্গ দেয়ালের বৈশিষ্ট্য এখানেও স্পষ্ট।
এ দুর্গটির কথা আগে পড়েছি। পর্তুগালের ইতিহাসের সঙ্গে দুর্গটির ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে। মুসলিম বিজেতাদের গড়া এ দুর্গটির স্থানীয় নাম ‘ক্যাসেলো দ্য সাও জর্জ’। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে জানা যায় প্রাচীনকালেও এখানে একটি দুর্গ ছিল। এটি নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে। প্রতœতাত্ত্বিকরা মনে করেন, খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকেও এখানে একটি দুর্গ নির্মিত হয়েছিল। লিসবনে রোমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এ দুর্গ পুনর্নিমিত হয়। পরে মুসলিম অধিকারের পর নতুনভাবে গড়ে তালা হয় এ দুর্গটি। যা এখন দৃশ্যমান।
এ পাহাড়ে এবং দুর্গসংশ্লিষ্ট অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব যুগে কেল্টিক উপজাতি গোষ্ঠী বসবাস করত। এরপর এখানে আসে ফিনিশীয়, গ্রিক ও কার্থেজবাসী। এ ধারাবাহিকতায় এরপর এখানে একে একে বসতি গড়ে তোলে রোমান, ভিসিগথ এবং সবশেষে মুসলমানরা। মুসলমানদের হাতে এ দুর্গটি নতুন রূপ পায় ১০ শতকে।
লিসবন থেকে মুসলমানরা বিতাড়িত হয় ১১৪৭ খ্রিস্টাব্দে। এ বিতাড়নে ভূমিকা রাখেন আফোরসো হেনরিখ এবং উত্তর ইউরোপের নাইটরা। ২য় ক্রুসেডের সময় এরা লিসবন দখল করে নিয়েছিলেন। ক্রুসেডে খ্রিস্টানদের ধারাবাহিক পরাজয়ের মধ্যে এটিই ছিল উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
পর্ব (০৬)
নীরব রাতে এভোরায়
রাত সাড়ে এগারোটায় এভোরা টার্মিনালে আমাদের বাস ভিড়ল। মনে হল পুরো শহরটি ঘুমিয়ে আছে। টার্মিনালেও খুব একটা মানুষের সাড়া নেই। একটি মাত্র ট্যাক্সি দাঁড়িয়েছিল। ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক। চেহারা ও আকৃতিতে পর্তুগিজ বলেই মনে হল। বনি পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলে নিল। আমার ট্রলিব্যাগটা পেছনের বনেটের ভেতরে রাখলাম। রাস্তায় কাকপক্ষীটিও নেই। শহরের এদিকটিতে তেমন উঁচু কোনো ইমারত চোখে পড়ল না। দোকানপাট, অফিসপাড়া, বাড়িঘর যা দেখতে পেলাম তা চারতলার বেশি নয়। কিন্তু পুরো শহরটি যেন সাজানো-গোছানো। বৈদ্যুতিক বাতিতে যতদূর দেখা যাচ্ছিল- সব ঝক ঝকে তক তকে। দেয়ালে রং চটে যাওয়া কোনো ঘরবাড়ি চোখে পড়ল না। প্রশস্ত রাস্তা। সব ধরনের দালানকোঠার সামনেই চওড়া লন। ঢাকা শহরের ঘিঞ্জিদশার ছবিটি একবার কল্পনা করলাম।
বনি জানাল, এখানে শহরের দুটো অংশ আছে। একটি রোমান ও মুসলিম আধিপত্যের যুগে গড়া দুর্গ ঘেরা নগরী আর দুর্গের বাইরে আধুনিক নগরী। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার থাকার ব্যবস্থা করেছে দুর্গ-নগরীর ভেতরে ‘এভোরা ইন’ নামের হোটেলে। দুর্গ-নগরীর ভেতরেই বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। যেমন- এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, প্রাচীন বিখ্যাত চার্চ, রোমান মন্দির, রোমান ফোরাম, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্য বিতান, পার্ক ইত্যাদি। বনিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকে। হোস্টেলটি দুর্গ-নগরীর বাইরে।
এক সময় দুর্গ দেয়াল চোখে পড়ল। স্পষ্ট হল মধ্যযুগের দুর্গ-দেয়ালের আদল। দুর্গ-তোরণের ভেতর দিয়ে ঢুকে গেল ট্যাক্সি। এবার রাস্তার রূপ পাল্টে গেল। ভেতরের রাস্তা তেমন প্রশস্ত নয়। পিচঢালা মসৃৃণও নয়। সব পাথরের নানা টুকরো বসানো যেন। আসলে প্রাচীন রোমানদের রাস্তার আদল অবিকল ধরে রেখেছে আধুনিক এভোরা। যেন দুর্গের ভেতরে ঢুকলে ইতিহাসে
ফিরে যাওয়া যায়। মনে মনে ঠিক করলাম, কাল দিনের আলোতে সব পরখ করতে হবে।
আমরা এসে থামলাম চারদিকে সাজানো পুরনো স্থাপত্যশৈলীর অনেকগুলো ইমারতের মাঝখানে প্রশস্ত উন্মুক্ত একটি স্কয়ারের সামনে। দুর্গ-শহরের এটাই প্রাণকেন্দ্র। এর নাম জিরালদো স্কয়ার। এখানে কোনো ইমারতই চারতলার বেশি নয়। স্কয়ারের দু’দিক দিয়ে ঘোরানো রাস্তা। ডানে-বামে, সামনে-পেছনে বেরিয়ে যাওয়ার অনেক রাস্তা রয়েছে। উত্তর দিকে পূর্ব-পশ্চিমে যে টানা ইমারত রয়েছে, এরই মাঝামাঝি ‘এভোরা ইন’ দেখতে পেলাম।
পোস্টের শর্ট লিংক : http://wp.me/p1DnUE-s2
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s