Category Archives: ধারাবাহিক

বিশ্বের সাজানো বিপ্লব তথা ম্যানুফ্যাকচারড রেভল্যুশান

https://i2.wp.com/www.tomatobubble.com/sitebuildercontent/sitebuilderpictures/tumblr_mdy00.jpgগত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তা হলো, কোন বিপ্লব আসলে বিপ্লব নয়। ২০০০ সালে সার্বিয়ায় স্লোবোদান মিলোসেভিচের (Slobodan Milosevic) পতন পরবর্তীকালে জর্জিয়ার এডওয়ার্ড শেভার্দনাদজে (Edward Shevardnadze), কিরগিস্তানের আস্কার আকায়েভ (Askar Akayev) ও ২০০৪-এর নির্বাচনে ইউক্রেনের ভিক্তর ইউশেভচেঙ্কোর (Viktor Yushchenko) পতনের দিকে লক্ষ করলে এ প্রশ্নের ভিত্তি সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, এ ধরনের ঘটনাগুলো সমস্যায়িত নয়। তারা এ প্রসঙ্গে যুক্তি-তর্ক উত্থাপন করতে চাইছেন। তাদের দৃষ্টিতে এগুলো ১৯৮৯-এর ঘটনার ধারাবাহিকতায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে যাওয়া জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। Continue reading বিশ্বের সাজানো বিপ্লব তথা ম্যানুফ্যাকচারড রেভল্যুশান

পৈশাচিক নেক্রোফিলিয়া বা শবাসক্তি (পর্ব-১)

প্SPN_Necrophiliaরত্নতত্ত্বে অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমরা অতীত রাজা রাজড়াদের নানা ধরণের অবাক করার মতো খেয়াল খুশির পরিচয় পাই। এর মধ্যে অদ্ভুদ কিছু বিষয় যেমন মানুষের চিত্তকে বিচলিত করে তেমনি কিছু বিষয় আছে যেগুলো শুনলে ঘৃণায় মুখ বিকৃত করতে হয়। আমার একটা অভ্যাস আছে অবসর সময়টুকু বেশিরভাগই কাটাই হয় বই পড়ে কিংবা নেটে ব্রাউজিং করে যেখানে প্রত্নতত্ত্ব আর ইতিহাসই কেন্দ্রে থাকে। আর প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই এটা আমাকে এতটাই টানে যে আমার লেখাপড়ার গণ্ডিটা অনেকটা প্রত্নতত্বের মধ্যেই কিভাবে যেন আটকে গেছে। জা. বি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে তখন তৃতীয় বর্ষের মাঝামাঝি পড়ি এমনটা হবে। একটি সংবাদপত্রে ফিচার লেখার প্রস্তাব পেয়ে মিশরীয় মমির কিছু ছবি দেখছিলাম। ফিচার লেখার তুলনায় আমার অনুসন্ধিৎসু চোখ নিবদ্ধ হয় একটি বিশেষ বিষয়ের প্রতি। তখন ঐ প্রবন্ধ শেষ করার কাজ অনেক পিছিয়ে যায়। আমি ভাবতে থাকি অন্য বিষয় নিয়ে। Continue reading পৈশাচিক নেক্রোফিলিয়া বা শবাসক্তি (পর্ব-১)

মিশেল ফুঁকো ও উত্তর আধুনিক চিন্তাকাঠামো

urlবিশিষ্ট দার্শনিক ও উত্তর আধুনিক চিন্তাধারার অন্যতম পুরোধা মিশেল ফুঁকো ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের Poitiers নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ফ্রান্সের বিশিষ্ট সার্জন পল ফুকো ছিলেন তাঁর বাবা। বাবা তাঁর নাম রেখেছিলেন পল-মিশেল ফুকো, সেই সাথে ইচ্ছা ছিল জ্ঞানচর্চা শেশে ফুঁকো বাবার মতো চিকিৎসক হবেন। শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক সময় বেশ ভালোভাবে কাটতে থাকে তার। তবে তাঁর প্রতিভার বিকাশ লক্ষ করা যায় বিখ্যাত জেসুইট কলেজ সেন্ট-স্টানিসলাসে ভর্তির পর। পড়াশোনায় বিশেষ সাফল্য তাঁকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ফ্রান্সের মানবিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান École Normale Supérieure
– এ প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। তবে এখানকার জীবন ফুকোর জন্য ছিল বেশ কষ্টকর। নানা কারণে তিনি প্রচণ্ড অবসাদগ্রস্ততা ও হতাশায় ভুগতে থাকেন। একসময় মানসিক বৈকল্য তাকে মনোচিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হতে বাধ্য করে। তিনি এরপর হটাৎ মনোবিজ্ঞানে বিশেষ আগ্রহী হন। Continue reading মিশেল ফুঁকো ও উত্তর আধুনিক চিন্তাকাঠামো

ঘুরে আসতে পারেন ইদ্রাকপুর জলদুর্গ

আনুমানিক ১৬৬০ সালের দিকে বাংলার সুবাদার মীর জুমলা নির্মিত ইদ্রাকপুর দুর্গটি ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ইছামতী নদীর পূর্ব তীরে মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরে অবস্থিত। বর্তমানে নদী দুর্গ এলাকা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠেছে। নদীপথ শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখতে নির্মিত ইদ্রাকপুর জলদুর্গটি পূর্ব ও পশ্চিমে দু’ভাগে বিভক্ত। পূর্ব অংশ আয়তাকার এবং পশ্চিমের অসম আকৃতির দুটি অংশ মিলিত হয়ে সম্পূর্ণ দুর্গটি নির্মিত হয়েছে। Continue reading ঘুরে আসতে পারেন ইদ্রাকপুর জলদুর্গ

হুমায়ুন আহমেদের বই ডাউনলোড

humayun_5সবাইকে অবাক করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন হুমায়ুন আহমেদ। কিন্তু রেখে গেছেন অগণিত স্মৃতি। রেখে গেছেন অগণিত বই। এই বইগুলো শতাব্দী ধরে স্মরণ করাবে প্রিয় লেখককে। একজন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যকে কি দিয়ে গেছেন সেটা দেখার সুযোগ হয়নি। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে অতিরিক্ত লাফালাফি আর শুশীলদের আতলামি যারপরনাই বিরক্ত করেছে আমায়। সে দিক থেকে বিচার করলে আমার হিসেবে বাংলাদেশী সাহিত্যিক হিসেবে হুমায়ুন আহমেদের স্থান সবার উপরে। বিশেষ করে সংখ্যাতাত্ত্বিক দিকে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে। এক্ষেত্রে তিনি মানে,গুণে যোগ্যতা আর নৈপূন্যে সবার থেকে অনন্য।

বইগুলোর নামসহ লিংক..

 ১. একটি সাইকেল এবং কয়েকটি ডাহুক পাখি
২. বাদশা নামদার
৩. হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী
৪. পুফি
৫. ম্যাজিক মুন্সী
৬. বল পয়েন্ট
৭. কাঠ পেন্সিল

Continue reading হুমায়ুন আহমেদের বই ডাউনলোড

দজলা-ফোরাতের দেশ পর্ব এক (সুমেরীয় সভ্যতা)

নীলনদের তীরে গড়ে ওঠা পিরামিড আর মমির দেশ মিশরের পশ্চিমে লোহিত সাগর। লোহিত সাগরের উত্তর দিকে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম ঘেঁষে একটি চমৎকার ভূখণ্ড এগিয়ে গিয়েছে আরও উত্তরে। এশিয়া মাইনরকে উত্তরে রেখে দ্বিতীয়া পাওয়া চাঁদের মতো বাঁক নিয়েছে। দক্ষিণে নেমে এসেছে পারস্য উপসাগরের সীমানায়। চাঁদ-আকৃতি আর উর্বর মাটির জন্য অনেকের কাছে ভূখণ্ডটির নাম ফার্টাইল ক্রিসেন্ট বা অর্ধচন্দ্রাকৃতির উর্বর ভূমি। এই অঞ্চলেই গড়ে উঠেছে প্রাচীন পৃথিবীর বিখ্যাত মেসোপটেমীয় সভ্যতা। গ্রিক শব্দ ‘মেসোপটেমিয়ার’ অর্থ হচ্ছে ‘দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি।’ মেসোপটেমিয়ার পূর্ব দিকে বয়ে গিয়েছে টাইগ্রিস নদী, যাকে দজলা নদীও বল হয়। আর পশ্চিমে বয়ে গিয়েছে ইউফ্রেটিস নদী। একে অনেকে বলে ফোরাত নদী।  Continue reading দজলা-ফোরাতের দেশ পর্ব এক (সুমেরীয় সভ্যতা)

মধ্যযুগে বাংলার ধর্মচিন্তায় সুফিবাদ পর্ব -৩

মুসলিম আগমন-পূর্ব বাংলার ধর্মচিন্তার প্রতি দৃষ্টি দিলে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় বাংলা ও বাঙালির ধর্মচিন্তা মূলত আবর্তিত হতো হিন্দু-বৌদ্ধ একটি মিশ্র ধর্মীয় ভাবধারাকে ঘিরে। অবস্থানিক বিচার করতে গিয়ে আমরা দেখি বৌদ্ধধর্মের বজ্রযানী ও তান্ত্রিক দর্শন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের সাথে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য নির্দেশ করা বেশ কঠিন ছিল। অন্যদিকে বাংলার এই ধর্মীয় কাঠামোতে সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন আঙ্গিকের মুসলিম একেশ্বরবাদী ধর্মদর্শন প্রতিষ্ঠা পাওয়া অনেকাংশেই বেশ দুষ্কর ছিল। তবুও সুফিদর্শনের প্রভাবে বাংলার ধর্মচিন্তায় ইসলাম ধর্মীয় চিন্তাধারা এমন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা পায় যেখানে কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মীয় সমাজ কাঠামো অনেকাংশে হুমকির মুখে পড়ে। পরবর্তিকালে আমরা হিন্দু ধর্মের এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নিতে সুফি ভাবধারার আঙ্গিকেই গড়ে ওঠা চৈতণ্যদেবের ভক্তিআন্দোলন প্রতিষ্ঠা পেতে দেখি। তের শতকে বাংলার রাজদণ্ডে মুসলিম শক্তির আরোহনের বহুপূর্বে প্রায় প্রায় এগার শতকের দিক থেকে বাংলার জমিনে মুসলিম সমাজ কাঠামো বিকশিত হতে থাকে। কিন্তু সমসাময়িক তেমন কোনো ঐতিহাসিক সূত্র না মেলায় এই বিষয় বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ করাও দুষ্কর। ইতিহাসের পট পরিক্রমায় এই ধারাবাহিক রচনার বিগত পর্বে সেন শাসনের অরাজকতায় হিন্দু সমাজের মধ্যে যে শ্রেণী বিভাজন, স্বার্থন্বেষী ও দমনমূলক নীতি প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রসঙ্গটি উল্লিখিত হয়েছে। এই অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু সমাজের ঐক্য ধরে রাখতে যথেষ্ট ছিল না। বরং বুমেরাংই হয়েছিল। হিন্দু সমাজের সাধারণ মানুষ একদিকে যেমন ধর্মচর্চা থেকে বিতাড়িত হয়েছিল তেমনি তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক অধিকারের সকল ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়ে কোনঠাসা হয়ে পরেছিল। এই নড়বড়ে ধর্মীয় ও আর্থসামাজিক কাঠামোয় দাঁড়ানো বাংলায় আগমন ঘটতে থাকে মুসলিম সুফি সাধকদের। যাঁদের উৎসভূমি ভারতবর্ষের বাইরে হলেও ধর্মদর্শণ প্রচারের সুবিধায় তাঁরা অনেকটাই ভারতীয় অধিবাসীদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন।
সুফিদর্শন বিশ্লেষণের পূর্বে এই সুফি শব্দটির শাব্দিক বিশ্লেষণ জরুরী মনে করছি। ইতিহাসবিদদের ধারণা অনুযায়ী আরবি শব্দ ‘সাফা’ অর্থাৎ পবিত্রতা থেকে সুফি কথাটির উদ্ভব। কেউ কেউ মনে করেন ‘সুফ’ বা শ্রেণী হতেও সুফি শব্দ উৎপত্তি লাভ করে থাকতে পারে। তবে সবথেকে নির্ভরযোগ্য বিষয়টি আমরা পাই অধ্যাপক গিব ইবনে সিরিনের বিশ্লেষণ থেকে যে ব্যাখ্যাটি এসেছে সেখানে। অধ্যাপক গিব দেখিয়েছেন ইসলামের এই ধর্মীয় সাধকগণ একধরণের রঙিন পশমী কাপড় পরিধান করতেন যেমনটি খ্রিষ্টানধর্মীয় সাধকরাও একসময় ব্যবহার করেছেন। এই কাপড়ের নাম ‘সুফ’ বা সউফ। এর থেকেও সুফি শব্দটির উৎপত্তি হতে পারে। তবে ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানি রাসূল সা. এর জামানায় বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান সাহাবী ছিলেন যাঁদেরকে দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় বেহেশতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। নিজেদের সহায় সম্পত্তি সবকিছু আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দিয়ে মসজিদের সমতল ছাদের নিচে অবস্থান নেয়াতে তাদের বলা হতো ‘আসহাবে সুফফা’। তাঁদের নামের পরবর্তিত রূপ থেকে সুফি শব্দটির উৎপত্তি ঘটে থাকতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছেন। প্রকৃত অর্থে অধ্যাপক ম্যাসিগননের বিশ্লেষণ থেকে বলা যায় ইসলাম ধর্মের ধ্র“পদী কঠোর সংযমের রীতি যার উৎপত্তি মহাগ্রন্থ আল-কোরআন এবং রাসূল সা. এর জীবনাচরণ থেকে সেটাই দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়ে সুফিবাদী দর্শনের জন্ম দেয়। এই সকল ইসলাম ধর্মীয় সাধকগণ মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. কে প্রথম এবং হযরত আলীকে দ্বিতীয় আধ্যাত্মিক নেতা ও দিকনির্দেশনা প্রদানকারী হিসেবে শ্রদ্ধা করে থাকেন। সাংসারিক ধর্ম হিসেবে ইসলামকে কৃচ্ছ্বপরায়ণ নীতির বিপরীতে ভাবা হলেও এর আদিপুরুষদের মধ্যে অনেকে যেমন প্রধান চার খলিফা, বিশিষ্ট সাহাবী হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা., হয়রত সালমান ফারসী রা. সহ বেশ কয়েকজন বিখ্যাত মুসলিম শাসক ও নেতা এই রীতি বেশ কঠোরতার সাথে পালন করেছেন। তাঁদের নিকট ইসলাম ছিল আত্মার সংযম ও আধ্যাতিœকার সাধনা। কেবলমাত্র কয়েকটি ধর্ম নির্ভর আচার অনুষ্ঠান পালনের সমষ্টি নয়। এই সকল মহান সাধক সদা সচেষ্ট ছিলেন কিভাবে ধর্ম হিসেবে ইসলামকে মানুষের কল্যাণের কাজে লাগানো যায়। প্রাথমিকভাবে আরব থেকে উৎপত্তি লাভ করে হাসান বসরীর (র.) মাধ্যমে এই দর্শন পারস্যে বেশ ভালভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে সুফিবাদের মূলমন্ত্র হচ্ছে তীব্র ভালবাসা, ত্যাগ ও মানবতার কল্যাণের মাধ্যমে আত্মার নৈকট্য লাভ ও মহান আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা। এই ক্ষেত্রে শরীয়ত, তরিকত, মারিফত, হাকিকত, ফানা ফিল্লাহ এবং বাকি বিল্লাহ প্রভৃতি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমত সঠিক নির্দেশনা অনুযায়ী জীবনধারণ করতে হয় পরবর্তিকালে একজন ধর্মগুরুর সান্নিধ্যে থেকে আধ্যাতিœক শিক্ষালাভ করে জিকর আসকারের মাধ্যমে নিজের আধ্যাতিœক উন্নতি ঘটাতে হয়। পরবর্তি সময়ে একজন সুফির স্তর বা ফানাফিল্লাহ স্তরে উন্নীত হতে হয়। শেষ ধাপে আতœার উৎসর্গে আল্লাহর নৈকট্যলাভই বাকিবিল্লাহ স্তর। কেমলমাত্র জিকির আসকার ও ধর্মীয় ইবাদত করে নিজেদের আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন নয়, সুফিসাধকগণ সর্বত্র মানবতার কল্যাণে থাকেন নিবেদিতপ্রাণ। তাঁদের দর্শনের অন্যতম দিক মানবতার কল্যাণ সাধনের মাঝেই আত্মার পরিশুদ্ধি আসে। অবস্থান ও সমাজ সংস্কৃতিগত দায় মেটাতে পরবর্তিকালে সুফি দর্শন বেশ কয়েকটি সম্প্রদায় কারো কারো মতে ১৭৫ টি সুফিধারায় বিভক্ত হয়ে পড়লেও তাদের নীতিগত দিক ও অবস্থানিক মানদণ্ড বলতে গেলে ঐ একই অর্থাৎ আত্মার পরিশুদ্ধি আর মানবতার কল্যাণই মুখ্য ছিল। যে কয়েকটি সুফি সম্প্রদায় বা সুফিধারার প্রভাব ভারতীয় ধর্ম দর্শণকে তাড়িত করে তার মধ্যে খাজা মুইনুদ্দিন চিশতীর প্রবর্তিত চিশতীয়া তরিকা, বাহাউদ্দীন জাকারিয়ার সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা, আবদুল কাদের জিলানীর কাদিরিয়া তরিকা,খাজা বাহাউদ্দীন নক্সবন্দীর নকশবন্দীয়া তরিকা মুখ্য ছিল।
মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে বিভিন্ন সময়ে শত শত সুফি দরবেশ বাংলাদেশে আসতে থাকেন তাঁরা মূলত চিশতীয়া ও সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার ছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আগমন ঘটতে থাকলেও সেন আমলের দু:শাসন ও জনমনে অস্বস্তির হেতু মানবতাবাদী সুফি দর্শন বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে সক্ষম হয়। কয়েকজন বিখ্যাত সুফির শিক্ষার ভিত্তিতে বিকশিত মরমী গোষ্ঠী থেকে বাঙলায় সুফিবাদ কেমন চূড়ান্তভাবে বিকশিত হয়েছিল তা অনুমান করা যায়। উত্তর ভারত ও পশ্চিম এশিয়া থেকে বাংলার অধিকাংশ অংশে সুফিদের আগমন ঘটে। সুফিগণ হিন্দু ও বৌদ্ধদের মরমী চিন্তাধারার আরও অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। ফলে তাঁদের মাঝে মৌলিক সুফি দর্শনের সাথে অবস্থানিক দায় মেটাতে গিয়ে একটি হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সংস্কৃতিক ভাবধারার মিশ্রিত রূপ লক্ষ করার যায়। তবে এর প্রভাবে বাংলার সুফিগণ এক অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হন। তাঁদের শিক্ষা বিশেষত কুসংস্কারপ্রবণ সমাাজ, হিন্দু ধর্মীয় নানা আচরণ, শাক্ত সমাজ ও জ্যোতিষ ভাবধারার উপর আস্থা স্থাপনকারী সমাজকে ব্যপক প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল। যার প্রমাণ হিসেবে পরবর্তিকালে আমরা দেখি হিন্দু ধর্মের ক্ষয়িষ্ণু দশায় চৈতণ্যদেবের ভক্তি আন্দোলনেও এই একই আদর্শ প্রভাব ফেলেছিল। আমরা বাস্তবতা যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টি একটি আঙ্গিক হতে বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছি। আমাদের কাছে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়েছে ‘সেন শাসন প্রভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মের কঠোরতা ও আচারসর্বস্বতার পাশাপাশি কেবল একটি শ্রেণির একচ্ছত্র আধিপত্য ও বাকিদের অস্পৃশ্যতার বদলে সুফিদের প্রচারিত ধর্মদর্শনে ছিল মানবিকতার আবেদন ও সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ। পাশাপাশি সুফিদের সমাজসেবা, মানুষের প্রতি ভালবাসা, ব্যক্তিত্ব, অলৌলিক ক্ষমতার পাশাপাশি নৃতাত্ত্বিকভাবে সুদর্শন ও দৈহিক গঠনে দাক্ষিণাত্যের ব্রাহ্মণ শাসকদের তুলনায় একটু এগিয়ে ছিলেন। প্রাসঙ্গিকতার কারণে অনুমেয় যে সাধারণ মানুষ অত্যাচারী ব্রাহ্মণদের বিপরীতে এই ভিনদেশী ভিন্নধর্মী সুফিদের অনেকটাই দেবতার আসনে বসিয়েছিল। ফলে ইসলামের সাম্যবাণী বয়ে আনা দুরদেশী সুফিদের প্রতি সাধারণ মানুষের এই শ্রদ্ধা ও অনুরক্তি একদিকে বাংলায় ইসলাম প্রসারের পথ যেমন প্রসারিত করে অন্যদিকে কঠোর সাম্প্রদায়িক, গোঁড়া, বর্ণবিদ্বেষী ও মৌলবাদী ব্রাহ্মণ্যধর্মের ভিত্তিমূলকেও আঘাত করে। ফলে এক সময় হিন্দু ধর্ম বাংলা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার যোগাড় হয়। পরবর্তিকালে হিন্দুধর্মের মহান সংস্কারক চৈতণ্যদেবের ভক্তিআন্দোলন চৈতন্যহীন হিন্দুধর্মের চেতনা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলে হিন্দু ধর্মের অবস্থান এযাত্রা রক্ষা পায় যা পরবর্তিপর্বে আলোচিত হবে। তবে এটা খুব ভালভাবে জানান দিয়ে যায় যে ধর্ম হোক , সামাজিক প্রথা হোক আর ক্ষমতাই হোক তাতে যদি জনগণের অংশগ্রহণ না থাকে, তা যদি জোর পূর্বক ঘোড়ার জীনের মতো মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় তা এক সময় মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবেই হবে। আর বিপরীতে মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার সুফল যে কতটা তা সুফিদের সাফল্য থেকেই অনুমান করা যায়।
সময় ও স্থানের ভিন্নতায় সুফি দরবেশ ও তাঁদের অনুগামী শিষ্যরা বাংলার মাটিতে নানা স্থানে তাদের অবস্থান সুসংহত করেন। তাঁদের অবস্থান প্রথানত সেন প্রশাসনিক এলাকা এড়িয়ে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা মূলত ধর্মীয় আদর্শের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও চরিত্র গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সুফিদের মানবিকতার আদর্শ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে যুক্ত হয়েছিল ইসলামের উদারতা ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ যা কার্যত সুফিরা সমাজের নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত, অধঃপতিত মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। এটাও সুফিদের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ। সুফিদের ভূমিকা মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বেই অগণিত অধিকার বঞ্চিত হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্তজ শ্রেণির মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করে নিজের জীবনের নতুন করে অর্থ খুঁজে পেতে সুযোগ করে দেয়। যা দেখে আরো বেশি সংখ্যক মানুষ সুফিদের মানবতাবাদী দর্শনে আকৃষ্ট হতে থাকে। বিভিন্ন সূত্র থেকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রখ্যাত সুফি শেখ জালাল উদ্দীন তাব্রিজি উত্তরবঙ্গের মালদহ ও দিনাজপুর জেলায় আগমন করলে বিপুল সংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। তকি উদ্দিন আল আরাবি,আখি সিরাজুদ্দীন, নুর কুতুব আলম, আলাউল হক প্রমুখ খ্যাতনামা সুফিদের নিকট উত্তর বাংলার বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম ক্ষমতা আরোহন পূর্বে একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। ড. মুর্তাজা আলীর বিবরণে হযরত শাহজালালের আগমনে হাজার হাজার হিন্দু কাতারে কাতারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বলে বলা হয়েছে। এমন ভাষ্যে আবেগীয় অতিরঞ্জন থাকতে পারে তবে তা বাস্তবতা বর্জিত নয়। এর সমর্থন পাওয়া যায় মরক্কোর প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার বিবরণীতে। বৃহত্তর ঝিনাইদহ-যশোর-খুলনা এলাকায় খান জাহান আলী এবং সোনারগাঁও অঞ্চলে প্রখ্যাত সুফি শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার বি¯তৃত কর্মকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়। ইসলাম প্রচার বাদেও বাংলায় মুসলিম রাজ্য বিস্তার ও সংহতি রক্ষার্থে সুফি-দরবেশদের ভূমিকা ছিল বেশ গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। কখনও হয়তো নিজেরা সরাসরি কিংবা কোন স্থানীয় শাসকের সহায়তায় রাজ্য জয়ও করেছেন এই সব সুফি দরবেশগণ। বিশেষ করে আমরা প্রখ্যত দুই বিজেতা হযরত শাহজালাল ও খান জাহান আলীর কথা জানি।
বাঙলার মধ্যযুগের আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রাজা গণেশের উত্থান। বাংলার সুলতানদের উদারনৈতিক শাসন বিশেষত যোগ্যতার ক্ষেত্রে ধর্ম, জাত স্থান কাল পাত্র বিচার না করার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখি সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহের শাসনকালের (১৩৮৯-১৪১০ খ্রি.) শেষ দিকে তাঁর হিন্দু এক অমাত্য রাজা গণেশ খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। পরবর্তিকালে দুর্বল হামজা শাহের সময় তিনি আরো বেশি ক্ষমতাধর হন। অনেকে মনে করেন পর্দার আড়ালে গণেশের প্ররোচণাতেই বায়েজিদ শাহ হামজা শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই প্রকৃত ক্ষমতা অনেকাংশে দখল করে নেন। পরবর্তিকালে মুজাফফর শাহের দুর্বলতার সুযোগ পুরোপুরি সদ্যবহার করে গণেশ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নানামুখী অনাচার চালাতে শুরু করেন। পরবর্তিকালে প্রখ্যাত সুফি নুর কুতুব আলম এর অনুরোধে গণেশকে শায়েস্তা করতে এগিয়ে আসেন জৌনপুরের শাসক ইবরাহীম শর্কী যে বিষয়ে এই নিবন্ধের প্রথমোক্ত লেখকের ‘মুদ্রায় ও শিলালিপিতে মধ্যযুগের বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি’ গ্রন্থে বি¯তৃত পরিসরে আলোচনার প্রয়াস রয়েছে। তবে বিজেতা বা ধর্ম প্রচারক কিংবা সমাজ সংস্কারক যাই বলা হোক না কেন এই ভূখণ্ডে সুফিদের আগমনের ধারাটি খুব একটা সুখকর ছিল না। সেনরা তাদের অত্যাচারী সিংহাসন সুসংহত করতে গিয়ে যেখানে স্বধর্মীদের নাকাল করে ফেলেছিল সেখানে এই ভিনদেশী মুসলিম সুফিদের শাসক কর্তৃক মেনে নেয়াটা কখনই তাদের বাস্তবতায় সম্ভব ছিল না । যার উদাহরণ হিসেবে করুণ পরিণতির শিকার হতে হয়েছিল বিক্রমপুরের রামপালে আগত সুফি বাবা আদমের শহীদ হওয়ার মধ্যদিয়ে। যদিও আমাদের দেশে প্রাথমিক দিকে সর্ব প্রথম আগত সুফি হিসেবে শাহ সুলতান রুমীর নাম পাওয়া যায়। নেত্রকোনার মদনপুরে তাঁর সমাধি রয়েছে। অঞ্চলটি তখন কোচ রাজাদের শাসন এলাকার ভেতরে ছিল। পাশাপাশি আমরা শাহ সুলতান বলখি মাহিসওয়ারের নাম ও পাই । যাঁর সমাধি রয়েছে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে।
সুফি সাধকদের কর্মকাণ্ড শুধু ধর্ম প্রচারের গণ্ডিতেই আবদ্ধ ছিল না। শিক্ষাবিস্তার ও একটি কল্যানমুখী সমাজ গঠনের পেছনে তাঁদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। যে সমাজ গড়ে উঠেছিল সেন শাসনের অত্যাচার নিষ্পেষণে জর্জরিত একটি সমাজের অচলায়তনের উপর। যেখানে মানবাত্মা গুমড়ে কাঁদছিল, হাহাকার করছিল আত্মপোলদ্ধির অনুশোচনায় ক্লান্ত সমাজের বিবেক, আর হতাশায় দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়েছিল মনুষ্যত্যের মৌলিক আবেদনগুলো। সেই সমাজের অধিকার বঞ্চিত মানুষের কাছে এই সুফিরা ভিনদেশী হলেও তাদের আগমন অনেকটা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপের পর বর্ষার প্রথম এক পশলা বৃষ্টির আশির্বাদের মতো। এই হিসেবে সুফিদের বিশেষ কৃতিত্ব দিতেই হয়। যদিও তাঁদের এই সমাজ গঠনের মূল আদর্শিক দিক ছিল ইসলাম প্রচার ও ইসলামী ও সমাজ গঠন। কিন্তু বাস্তবতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেছে তাঁদের এই প্রচেষ্টা কার্যত অনেক বেশি সেক্যুলার ও আধুনিক ছিল। ইতিহাস, প্রতœতাত্ত্বিক সূত্র, সহিত্যিক সূত্র, লোককাহিনী ও লোকগাথা থেকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করলে দেখা যাবে সুফিদের খানকাগুলোতে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের প্রবেশ অধিকার ছিল সমান। যা নিচু বর্ণের নিষ্পেশিত হিন্দুদের জন্য ছিল স্বপ্নাতীত। পাশাপাশি সেন আমলে সামন্তবাদ প্রসারের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর আরোপ, অনাকাঙ্খিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঘনঘটায় এমন অনেক হিন্দু ছিলেন যাদের গৃহে তিন বেলা চুলোয় আগুনই হয়তো জ্বলতো না। তারা নিজেদের উদর পুর্তির সহজ সুযোগ খুঁজে নেন সুফিদের লঙ্গরখানাতে। যা ধীরে ধীরে একদিন তাদের সুফিদের প্রতি একান্ত অনুগত করে তুলেছিল। কারণ সুফিদের লঙ্গলখানায় প্রবেশ ও খাদ্যলাভ করতে হলে শুধু একটি পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল। তাকে মানুষ হতে হবে। সে কে, তার জাত কি, ধর্ম কি, এগুলোর কোন বিচার করার হতো না। তবে আমাদের প্রচলিত অনুজ্ঞায় সেকুলারকরণের ইতিহাস ও নির্মিত ইতিহাসের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত ও বর্ণনায় দৃশ্যায়নের যে অভিন্ন ভেদরেখা কল্পিত হয় তার বিচারে একে, বিশেষত আমাদের উক্তিকে অনেকটা অলীক বলে উড়িয়ে দিতেই পথ খুঁজবেন এক শ্রেণির ইতিহাস বিদ। কিন্তু ইতিহাস এগিয়ে চলে আঁকর সূত্র নিয়ে। গবেষকের কাজ সেগুলোর মৌলিক দিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে মূল ইতিহাসের কাছাকাছি যাওয়া। কিন্তু এগুলো বাদ দিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিতণ্ডার ফাঁদ পেতে প্রচলিত ইতিহাসের সত্যের বিরোধিতা করলে তা প্রকৃত ইতিহাস চর্চায় গৃহীত হবে না। তথ্যসূত্রের আলোকে আলোচনা করতে গিয়ে দেখা যায় বাংলার সমাজ কাঠামোতে সুফিদের ভূমিকাকে আলাদা করে না দেখার কোন সুযোগ নেই।
শরফউদ্দীন আবু তাওয়ামা ছিলেন তেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধের খ্যাতনামা পণ্ডিতদের মধ্যে অন্যতম। ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাতে তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। তিনি সোনারগাঁওতে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করে বাংলার ও উত্তর ভারতের ছাত্রদের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করেন। এই মাদ্রাসার প্রখ্যাত শিক্ষক কাজী রুকন উদ্দিন আল সমরখন্দি অমৃতকুণ্ড নামের হিন্দু যোগশাস্ত্রের একটি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ— মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। সুফিদের সেক্যুলারনীতি প্রমাণ করতে গেলে এর থেকে আর কত বড় প্রমাণ দরকার। বাংলার ধর্মাচারের দিক নির্দেশনামূলক বেশ কিছু বই আমরা সুফিদের রচনা থেকে পাই। যেমন মরমীবাদের উপর রচিত আজিবা, সর্বেশ্বরবাদের উপর লিখিত ইরাশাদুল সালেকিন, সত্য সন্ধানীদের জন্য ইরশাদুল তালেবিন প্রভৃতি।
আবু তাওয়ামার পাশাপাশি আখি সিরাজুদ্দীন, শেখ আলী সিরাজ, শেখ আলাউল হক এবং হযরত নুর কুতুব আলম বাংলার মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বেশ সচেষ্ট ছিলেন বলেই দেখা যায়। তাঁরা কেবল মাত্র ইসলামী ও আধ্যত্মিক জ্ঞান প্রদান করেছেন এমনটি নয়। দর্শন, জীবনব্যবস্থা, সাধারণ জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাধারণ শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রেও তাদের আগ্রহী হতে দেখা যায়। আমরা রাজশাহীর বাঘায় প্রখ্যাত সুফি হামিদ দানিশমন্দের শিক্ষাকেন্দ্র থাকার প্রমাণ পাই। এটিকে তৎকালীন সময়ের কলেজ বা মহাবিদ্যালয়ের সমপর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। যেটা দীর্ঘদিন টিকে ছিল এবং মুঘল আমলে একজন পর্যটক আবদুল লতিফ এটিকে দেখেছেন বলে তার বিবরণে উল্লেখ করেছেন। এই সব সুফি দরবেশদের খানকাহ ও সংশ্লিষ্ট খানকাহগুলোকে তৎকালীন বাঙলার মানুষের আধ্যত্মিক ও বুদ্ধিভিত্তিক জগতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা যাচ্ছে। জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হাতে এই সকল শিক্ষাকেন্দ্র কেবল বাংলাদেশকেই আলোকিত করেনি আলোকিত করেছে পুরো ভারতবর্ষকেও।
সুফি দরবেশদের এই খানকাহগুলো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি পরিচিতি পায় জনহিতকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে। শিক্ষাকেন্দ্র ও ধর্মীয়কেন্দ্র হিসেবে অবস্থানের পাশাপাশি এই সকল খানকাহগুলোকে একটি অসহায়দের আশ্রয়স্থল হিসেবেও ধরা যেতে পারে। অনেক ধনী শিষ্যরা এই সকল খানকায় আশ্রয় গ্রহণকারী মানুষকে সাহায্য করা তাদের জন্য পূণ্য হিসেবে বিবেচনা করতেন। এখানকার চিকিৎসালয়ে একাধারে দেয়া হত চিকিৎসা অন্যদিকে লঙ্গরখানা হতে গরীব ও অভুক্তকে দলমতের বিবেচনায় না এনে সরাসরি খাবার দেয়া হতো। এ সবের ব্যয় সংকুলানের জন্য অভিজাত শ্রেণীর অনেকে বিষয় সম্পত্তি বা গ্রাম দান করতেন। এই সকল কারণে সুফি দরবেশদের খানকাহগুলো জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মতের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়ে যায়। এর ফলাফল হিসেবে ‘শেক শুভোদয়ার’ রচয়িতা হলায়ুধ মিশ্র সুফি জালালউদ্দীন তাব্রিজির প্রতি হিন্দুদের গভীর অনুরক্তির কথা উল্লেখ করেছেন । প্রতœতত্ত্বের আঙ্গিকে বা আধুনিক ইতিহাসের প্রত্যয়নে কোন বর্ণিত বিষয়কে ইতিহাসে ফ্যাক্ট হিসেবে স্বীকার করতে গেলে তাকে বস্তুপ্রমাণসিদ্ধ হতে হয় নয়তো বর্তমান সমাজের কোনো বিষয়কে তুলনা করে বুঝিয়ে দিতে হয়। সিলেটের শাহজালালেল দরগায় এখনো অনেক হিন্দু দম্পতি সন্তান লাভের পর এসে পায়রার উদ্দেশ্যে ধান ছিটাতে দেখা যায়, আর ভারতের আজমীর শরীফ প্রায় সকল জাতি ধর্মের মানুষ কর্তৃক পবিত্র স্থানের মর্যাদা লাভ সুফিদের ধর্ম সম্পর্কে উদার দৃষ্টিকেই সমর্থন করে। ফলে অন্য কয়েকটি বিষয়ের মতো ‘সুফি’ বিষয়টিতে হিন্দু-মুসলিম বিপরীতে দা-কুমড়া সম্পর্কের যে ইতিহাস রচনার অপচেষ্টা ভারতের সাবঅল্টার্ন গ্র“প করে যাচ্ছে তার সুযোগ থাকছে না। বরঞ্চ তারা ইতিহাসকে ফিরে দেখার নামে যে ফ্যাসিবাদী আচরণের চারাগাছ সবে রোপন করতে যাচ্ছেন তার বেঁচে থাকাটাই কঠিন করে দিচ্ছে। হলায়ুধ মিশ্র যে বিবরণ দিয়েছেন তা অনেকটাই পূর্ণতা পায় ক্ষেমানন্দ আর বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্যে। এই দুই হিন্দু ধর্মীয় কবিও সুফি সাধকদের মানবতাবাদী দর্শনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
ইতিহাস থেকে দেখা যায় বাংলায় মুসলিম অধিকারপূর্বে ও প্রাথমিক সুলতানী যুগের বাংলায় ইসলাম বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন সুফি সাধকরা। মুসলমান শাসকরা বাংলার রাজ-ক্ষমতায় বসার অনেক আগে থেকেই সুফিরা ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন যেখানে জোর জবরদস্তি ছিল না। সুফিরা বাংলায় প্রবেশকালে সেন রাজারা এদেশের সাধারণ মানুষকে নানাভাবে অত্যাচার করতো, অর্থনৈতিক দুরাবস্থার সাথে সমাজে ছিল না তাদের স্বীকৃতি। আধপেটা খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকাটাই ছিল বাস্তবতা। অসুখ হলেও ভালো কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। এই সাধারণ হিন্দুকে বলা হতো শূদ্র যাদের কিনা জন্মই ছিল যেন এক আজন্ম পাপ। সেন শাসকরা শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার তাকিদে নিজেদের ব্রাহ্মণ দাবি করে শূদ্রদের ঘৃণা করতো। এমনকি শূদ্রের ছোঁয়া লাগলে অপবিত্র হবে ব্রাহ্মণ এই রীতিও চালু ছিল। এই সব শূদ্র তথা সাধারণ মানুষ সেনদের খপ্পরে পড়ে তাদের যে আজন্ম পাপের প্রায়শ্চিত্য করছিল সুফিদের আগমনে তা থেকে তারা অনেকটাই রেহাই পায়।
বিশেষত আরব ও পার্শ্ববর্তী তুর্কিস্তান, ইরাক, ইরান প্রভৃতি দেশ থেকে সুফিরা আসেন বাংলায়। যারা স্বভাবতই কর্ণাটকের সেনদের থেকে সুন্দর দৈহিক গঠনের অধিকারী ছিলেন। তাঁদের আচরণ ছিল অনেক বেশি মানবিক। একারণে সুফিরা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করেন। খানকাহয় সুফিদের থাকার জায়গা আর ইবাদতখানার পাশেই বানানো হতো লঙ্গরখানা। খাবার রান্না করে বিনা পয়সায় গরীব মানুষকে খাওয়ানো হতো। খানকাহর ভেতরে হাসপাতাল স্থাপন করা হতো। চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়া সাধারণ মানুষকে বিনা পয়সায় এখানে চিকিৎসা দেয়া হতো। মক্তব মাদ্রাসা স্থাপন করে সেখানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়া হতো সবাইকে। নিজ ধর্মের শাসকদের কাছ থেকে এসব সুযোগ পাওয়া কল্পনাও করেনি শূদ্ররা। তাই সহজেই তারা সুফিদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরে। সুফিরা বলেন, সকল মানুষ ভাই ভাই, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। এসব কারণে সাধারণ মানুষ সুফিদের পছন্দ করতে থাকে। বেঁচে থাকার নতুন আশ্বাসে অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ফলে সুফিদের সাফল্যের পারদটাও আরো উচ্চে ঊঠে যায়।
১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে সুফি শাহ সুলতান রুমী নেত্রকোনা জেলার মদনপুরে খানকাহ স্থাপন করে যে ধারার সূচণা করেন এরপর থেকে একে একে সুফিরা প্রবেশ করতে থাকেন বাংলায় । বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে অনেক বেশি সংখ্যক সুফি আসতে থাকেন। তাদের মাধ্যমে দ্রুত সারাদেশে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটতে থাকে। মসজিদ, মাদ্রাসা খানকাহ গড়ে ওঠে। সুফিদের খানকায় যে কোনো ধর্মের মানুষের প্রবেশ করায় কোনো বাধা না থাকায় তা সর্বজনীন হয়ে ওঠে। একদিকে একটি নতুন ধাঁচের সমাজ কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে অন্যদিকে অনেক সহজসাধ্য হয়ে যায় সুফিদের ইসলাম প্রচারের কাজ। আর তার চূড়ান্ত পর্বে হিন্দু সমাজে ভাঙ্গন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরে শ্রীচৈতণ্যদেব স্বধর্ম ও সমাজ রক্ষার্থে সুফিদের কর্মভূমিকার আদলে হিন্দু ধর্মের নবরূপায়ন ঘটান। যা নব্যবৈষ্ণববাদ নামে হিন্দু ধর্মের একটি শাখা হিসেবে বাংলার প্রতিষ্ঠিত হয় ।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থী-গবেষক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
সাভার ঢাকা।

বাংলার ইতিহাসে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক

বাংলায় মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনুধাবন করতে হলে এদেশে মুসলমানদের আগমনের ধারাটি প্রথম বুঝতে হবে। বাংলায় মুসলমানদের সামরিক সাফল্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুসলমানদের আগমন ও মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠা তিনটি পর্বে সংঘটিত হয়েছিল। প্রথম পর্বটির শুরু আট শতক থেকে। এসময় আরব বণিকরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালির সমুদ্র তীরে নোঙর ফেলেন। বাণিজ্যিক কারণে মুসলমান বণিকরা ধীরে ধীরে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত হয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্র তীরাঞ্চলে এসে পৌঁছেছিলেন। এই আরব বণিকরা বাণিজ্যিক কারণে দীর্ঘদিন উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করেন। এদের কেউ কেউ স্থানীয় রমণী বিয়ে করেন। এভাবে সীমিত আকারে ঐ অঞ্চলে একটি মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। অবশ্য এই বণিক শ্রেণির মধ্যে ধর্মপ্রচারের কোনো উদ্দেশ্য কাজ না করায় এ পর্বে মুসলিম সমাজ বিস্তার তেমন গতি পায়নি। তবে এই বণিক মুসলমানদের রচিত পথ ধরেই একদিন Continue reading বাংলার ইতিহাসে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক

‘মধ্যযুগ’ প্রত্যয়ের সাধারনীকৃত অর্থ ও ইতিহাসের মূল বাস্তবতা (পর্ব এক জুন ২০১১)

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কৃষিভিত্ত্বিক সমৃদ্ধ অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশের মাটিতে বারবার বিদেশী শক্তি আক্রমণ শানিয়েছে। পেশীশক্তি আর সামরিক কৌশলে দুর্বলতার কারণে পরাজিত হতে হলেও এই ভূখন্ডের মানুষের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্টকে সামনে রেখে বহিঃশক্তির কাছে অসহায় আত্মসমর্পন করার নজির ইতিহাসে নেই। প্রয়োজনে বাংলার মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে তবুও বিবেক বিসর্জন দিয়ে আত্মমর্যাদাকে ধিকৃত করেনি। প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণ আর সুত্র বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশীদের এই গৌরবোজ্জল ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হয় মধ্যযুগে এসে। মধ্যযুগের শুরুতে একে একে বানিজ্য, ধর্মপ্রচার আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলা অভিমুখে সফল অভিযানের ধারাবাহিকতায় তের শতকের গোড়ার দিক থেকে মাঝামাঝি সময়ে রাজদণ্ডে মুসলিম শক্তির আরোহন লক্ষ করা যায়। ভূপ্রাকৃতিকভাবে বাংলার সুরক্ষিত অবস্থান আর অবারিত সম্পদের মোহে পড়ে বাংলার শাসকগণ বার বার দিল্লীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন যা বাংলার সমাজ সংস্কৃতিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে।

বস্তুুত এই স্বাধীনতা ঘোষণার ফলেই তাঁরা দিল্লীর শাসকবর্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নিজেদের অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে বাংলার মানুষকে একান্ত আপন করে নিতে সচেষ্ট হন। নিজেদের প্রয়োজনেই বাংলাকে তারা নিজের দেশের মতো মনে করতেন।  অস্তিত্ত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকতেই তাঁরা পূর্ণ মেধা, শ্রম , নিষ্ঠা আর পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে এদেশীয় ধারার সংমিশ্রনের একটি নতুন সংস্কৃতি বিকশিত হতে ভূমিকা রাখেন। ফলে যাই হোক সমৃদ্ধ হতে থাকে বাংলার সমাজ সংস্কৃতির নানা দিক। অন্যদিকে হিন্দু সমাজের পাশপাশি বেশ দাপটের সাথে মুসলিম সমাজ বিকশিত হতে থাকে। এই সব বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থা,বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, বস্ত্রশিল্প, যাতায়াত ও পরিবহন,বানিজ্য ও অর্থনীতি  শিল্প-সাহিত্য, স্থাপত্যকলা, পোড়ামাটির অলংকরণ ও চিত্রকলা সহ নানাদিকে উন্নতির সুবাতাস বয়ে যায় মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলে। ১২০৪ থেকে শুরু করে ১৭৫৭ সালের দিকে পলাশির প্রান্তরে ইংরেজ উপনিবেশ বাদী শক্তির কাছে বশ্যতা স্বীকারের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘদিন বাংলার মধ্যযুগের শাসণ ক্ষমতায় বিভিন্ন সুলতান অধিষ্টিত ছিলেন একে তিনটি   স্তরে বিভক্ত করে আলোচনা করা হয়ে থাকে। এর মধ্যবর্তী অংশ অর্থাৎ ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে শুরু করে ১৫৩৮ এ সার্বভৌম বাংলার সুলতানদের মোগল শক্তির কাছে পদানত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলার সমাজ সংস্কৃতিতে সবথেকে বেশি উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল। যা ধারাবাহিক আলোচনায় আসবে।
এক.
শাব্দিক বিচারে ‘মধ্যযুগ’ । প্রেক্ষিতঃ  বর্হিবিশ্ব, ইউরোপ ও তৎকালীন বাংলা
ইতিহাসের বিচারে ইউরোপে ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে আলোকময়তাপর্বের সময়কাল শুরুর পূর্ববর্তী সময়কালকে ‘মধ্যযুগ’ বলে ধরা হলেও ভারত বর্ষের মধযুগ ধরা হয় মুসলিম আগমণের পর থেকে। জেমস মিলের ভারতের ইতিহাসের যুগ বিভাজনে হটকারী আচরণ করে ধর্মকে মূল মানদণ্ড বিবেচনা করেন। কিন্তু যখনই ইংরেজ যুগ শুরু হয় তাকে বেশ দক্ষতার সাথে খ্রিষ্ট্রান যুগ বা বলে বলা হয় বৃটিশ যুগ বা আধুনিক যুগ। এই ভাবে নামকরণ থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপের ইতিহাস রচনা, অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণে সতর্কতা অবলম্বন না করা হলে প্রতিক্ষেত্রেই এই রকম গোলকধাঁধার সামনে পড়তে হয়। এখানে ভারতবর্ষ তথা বাংলার ইতিহাসের মধ্যযুগকে বুঝাতে একটি প্রত্যয় ব্যবহার করা হয় ‘মুসলিম যুগ’। বর্তমান বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে লাদেন, সন্ত্রাসবাদ আর জঙ্গিবাদ যেমন সমার্থক হয়ে উঠেছে। ‘মধ্যযুগ’ শব্দটির সাথে তেমনিভাবে সারসত্তায়িত করা হয়েছে নৃশংসতা আর বর্বরতাকে এবং ইতিহাসের সাথে মিল রেখে এই সারসত্তায়নকে একটি বৈধতাও দেয়া হয়েছে। ধারাবাহিক রচনার শুরুতে আমি ’মধ্যযুগ’ শব্দটির স্বরূপ নিয়ে বিশেষত এই শব্দটির উপরে কিভাবে বর্বরতা ও নৃশংসতা আরোপিত হলো সেটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো। আসলে একটি শব্দ সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন ব্যবহারের মাধ্যমে তার পরিচিতি পায়। তাই প্রকৃত অর্থে কোন শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ নাই তার উপর অর্থ আরোপ করা হয়। যেমন আমরা যদি ছেলেবেলাতে কাঁঠাল গাছকে বাঁশ হিসেবে চিনে আসতাম সেখানে বড় হওয়ার পরেও তাকে বাঁশই বলতাম। তাকে কোনদিনই কাঁঠালগাছ বলে ভুল করতাম না। একটি শব্দ কোন বিশেষ সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে যখন ব্যবহৃত হয় তার উপর একটি অর্থ আরোপিত হয় যা তার পরিচিতি জ্ঞাপক। ‘মধ্যযুগ’ শব্দটি আর বর্বরতা বা নৃশংতা আজ কেন সমার্থক ?? কিভাবে কি ধরণের সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের উপর ভিত্তি করে এটি এর এই পরিচিতি লাভ করেছে এটি বুঝতে আমাদের সে সময়ের পারিপার্শিকতাকে বুঝতে হবে। আমাদের দেশে প্রাপ্ত প্রচলিত ইতিহাস গ্রন্থগুলো প্রায় সবই বৃটিশদের হাতে কিংবা তাদের পেটোয়া কোন বোদ্ধাদের হাতে রচিত যারা ভারত বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যতটা না জানতেন তার থেকে বহুগুণ বেশি আগ্রহী ছিলেন ইউরোপ ও ইউরোপের ইতিহাস সম্পর্কে। সারাটি জীবন ইউরোপ ইউরোপ গান করা আর বৃটিশ উপনিবেশবাদীদের পদলেহনে আত্মতুষ্টির পথ প্রশস্তকারী এই সব ইতিহাসবিদ যখন ভারতের ইতিহাস রচনার গুরুদায়িত্ব লাভ করেন। তখন তাদের কাছে ভারত আর ইউরোপ সাধারণীকৃত হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়। বরঞ্চ সারমেয় হিসেবেএকান্ত বিশ্বস্ত থেকে এই কর্ম যদি সফলভাবে সম্পাদন করে ভারতীয়দের হেয় করা যায় তখন এক আধটা শুকনো হাড্ডি জুটে যাওয়ার সম্ভাবণাও ছিল বৈকি। এই ইতিহাসবিদরা দেখেছেন  বৃটিশদের পায়ের ধুলায় স্থান চেয়ে কারো ভাগ্যে বর হিসেবে প্রভুর পক্ষ থেকে নোবেল জুটেছে। তাই তাঁরা ভেবেছেন  যদি পায়ের ধুলায় গড়াগড়ি দিয়েই নোবেল পুরষ্কার আসে তাহলে পায়ের তালুটা যদি একটু চেটে দেয়া যায় স্বয়ং রাণীর কাছ থেকে বর আসলেও আসতে পারে।
ভারতের মধ্যযুগে বিভিন্ন নগর ভিত্ত্বিক শাসনকাঠামো পরিলক্ষিত হয়। যার উদাহরণ হিসেবে আমরা প্রচুর প্রাচীর বেষ্টিত সুরক্ষিত মধ্যযুগীয় দুর্গনগরী পাই। আর বাংলার ক্ষেত্রে বিষয় ছিল আরো অনেক বেশি বৈচিত্রময়। এখানে মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতির চুড়ান্ত বিকাশের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে টাকশাল নির্ভর শহর গড়ে উঠতে দেখা যায় যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। অন্যদিকে এই একই সময়ের ইউরোপের দিকে নজর দিলে আমরা দেখি সেখানে কৃষিনির্ভর গ্রাম্য সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল। ম্যানর বা এই সকল গ্রামের অধিপতি নাইটরাই ছিল সর্বেসর্বা আর সাধারণ মানুষের মর্যাদা ছিল পশুদের থেকে নিচে। নাইটরা তাদের ক্ষমতার কলেবর বৃদ্ধি করতে তাদের ম্যানরের পরিধি বাড়াতে সদা সোচ্চার ছিল। তারা প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিগ্রহ করতো, আইন আর পেশী শক্তি যেখানে ছিল সমার্থক। কোন দরিদ্র কৃষকের ঘরে সুন্দরী মেয়ে থাকলে তা অনেকটা অলিখিতভাবেই ওই সব নাইটদের হেরেমের সম্পত্তি বলে বিবেচিত হতো। সামাজির নিরাপত্তার অভাব, নিপীড়ন-নির্যাতন, মানহানী আর প্রাপ্য ন্যায্য অধিকার হরণে নারীরা তখন কোনঠাসা হয়ে পড়েছিল। ধর্মচর্চাকে অনেকটাই রবিবারের নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়ে শুধু ভোগবিলাস,লাম্পট্য, মারাহারি, খুন, ধর্ষন, নারী-নির্যাতন আর দখল-বেদখল নিয়েই তখনকার ইউরোপের রাজনীতি আবর্তিত হতো। এভাবে নাইটদের মারামারি খুনোখুনিতে মানুষের অসন্তুুষ্টির পাশাপাশি আরেকটি শ্রেণীও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। তারা তখনকার ইউরোপের পোপ বা খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা। একটি সময়ে তারা দেখিয়েছিলেন ধর্ম কতটা সুন্দর এবং শৈল্পিকভাবে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একজন মানুষকে শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম। এই সকল ধর্মগুরু বা পোপরা একদিকে রাজা রাজড়াদের উপরে ছড়ি ঘুরাতেন অণ্যদিকে সাধারণ মানুষকেও বেশ সুন্দরভাবে লালটুপি পরিয়ে তাদের কাছ থেকেও কলাটা মুলোটা কম আদায় করতেন না। নাইটদের দাপটে পোপের ক্ষমতা অনেকাংশেই কমে যায় তার কলা মুলোর সরাবরাহও বন্ধ হতে থাকে। তাই বিচক্ষন পোপ বুঝলেন এই নাইটদের ঝগড়া বিবাদ থামাতে গেলে তাদের রোষানলকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে। তাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত এক সভায় পোপগণ সম্মিলিতভাবে ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের ডাক দেন। পিটার দ্য হার্মিট কৃষক আর নাইটদের মধ্যে এই মর্মে বাণী প্রচার করেন যারা ক্রুসেডে যোগ দেবে তাদের সকল অন্যায় মহান যীশু মাফ করে দিবেন। তার বর্ণণায় ক্রুসেডে যাত্রা আর স্বর্গের টিকিট অনেটাই সমার্থক হয়ে ওঠে। তারপর পরপর সংঘটিত কয়েকটি ক্রসেডে নাইটদের জিঘাংসা চরিতার্থকারী নির্মম বর্বরতা পুরো মধ্যযুগের ইতিহাসকেই কলঙ্কিত করে। ১২১২ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত শিশু ক্রুসেড পৃথিবীর ইতিহাসের সকল বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যায়।
১২৯২ এর পর ক্রুসেডের উন্মাদনা থেমে আসলেও সেই অপকর্মের প্রমান হিসেবে পুরো মধ্যযুগের ইতিহাসই কলঙ্কিত হয়ে যায় তার সাথেই অনেনটা সাধারণীকরণের ফলে বিকৃত হয়েছে বাংলার মধ্যযুগ।
গত মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রোমানা মঞ্জুরের প্রতি তাঁর বিকৃত মস্তিকের স্বামী সাইদের আক্রমণের খবর অনেকটা হটকেকের মতোই বিকিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রচারমাধ্যম আর ডিজিটাল যুগে ব্লগ-ফেসবুক-টুইটার পাড়াও ছিল সরগরম। কর্পোরেট যুগের প্রচার নির্ভর বানিজ্যের প্রপাগন্ডায় একজন নারী কিভাবে পণ্যে পরিণত হন তা আমরা এর আগেও অনেক দেখেছি। কিন্তু  এই ক্ষেত্রে একজন অসহায়ের বিপদের দিনে গ্রীষ্মের দাবদাহের মাঝেও কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থেকে বেশ পরে বাজার দখলের লড়াইয়ে হটাৎ করে সহানুভুতির নামে মিডিয়া  যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশে মেতে ওঠে। দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা তাদের জ্ঞানের কুয়ো থেকে বের হতে না পারায় দেশের নামকরা পত্রিকার সম্পাদকীয় আর উপসম্পাদকীয় পাতাগুলো একটি  বস্তাপচা শব্দের নানামুখী উপমার রসালো উপস্থাপনায় টইটম্বুর হতে থাকে। এই বস্তাপচা ফসিল শব্দটিকে আমি চিহ্নিত করেছি ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ হিসেবে আর মনস্থ করেছি একে একটি ধারাবাহিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।প্রথমত যায় যায় দিন পত্রিকায় সাপ্তাহিক হিসেবে লিখতে মনস্থ করেছিলাম কিন্তু দশদিক পত্রিকাতে প্রতিমাসে একবার লিখতে হবে তাই অনেক সময় পাবো এই ভেবে শেষ পর্যন্ত এখানে লিখতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি। আমদের দেশের বাস্তবতায় মধ্যযুগ আর অন্যান্য দেশ এমনকি ভারতের মধ্যযুগও যে ভিন্ন ছিল এটা প্রমাণিত সত্য। কিন্তু ইতিহাস থেকে দিনের পর দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে সিনেমায় দেখা ক্রুসেডার নাইটদের বর্বরতাকে আমাদের দেশের সাথে অনেকটাই সাধারণীকৃত করে ফেলে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। আর পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে একটি বস্তাপচা শব্দ বছরের পর বছর বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেউ এসিড নিক্ষেপ করুক, স্ত্রীকে তালাক দিক, কোন অভিনেত্রী মডেলের সাথে তার ছেলে বন্ধুর ফস্টিনষ্টির ভিডিও ক্লিপ বের হোক,নারী নির্যাতন হোক, ইভ টিজিং হোক আর পাগলা বাবার চিকিৎসায় মানুষ বিভ্রান্ত হোক এ সবই যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতা। বাংলাভাষার সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডারে এর বাইরে মনে হয় আর কোন শব্দই নেই।
ধিক !! এই বিভ্রান্তির ইতিহাস লালনকারীদের জন্য। ধিক!! এই বস্তাপচা একটি শব্দের ব্যবহারে দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে কলঙ্কিতকারীদের এই কুপমন্ডুকতাকে। ইতিহাসের বাস্তবতায় সেই পাথর যুগ থেকে এক ধারাবাহিক সংস্কৃতিক উন্নয়ন আমাদের দেশের ইতিহাসকে তার দিশা দিয়েছে। যেখানে বিভিন্ন বহিঃশক্তি বার বার জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে সংস্কৃতিকে তার মূল ধারা থেকে গতিমন্থর করতে পারলেও একেবারে স্তব্ধ করে দিতে পেরেছে এমনটি নয়। ইতিহাসের সুত্র আর প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণকে সুত্র বিবেচনা  করে রাজনৈতিক ইতিহাসের বিপরীতে সমাজ সংস্কৃতির দিকে নজর দিলে বাংলার মধ্যযুগ ছিল এক উজ্জল অধ্যায়। আমার ধারবাহিক রচনাগুলো যদি চালিয়ে যেতে পারি সেখানে রাজনৈতিক ইতিহাসের থেকে মধ্যযুগের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সবসময় আলোচনার টেবিলে অনুপস্থিত সমাজ সংস্কৃতির চিত্রই স্থান বেশি পাবে।  তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বাংলার মধ্যযুগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকেও কিছুটা দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। শাসতন্ত্রের ধারার উপর ভিত্তি করে আমরা মোটাদাগে বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসকে দুটি কালপর্বে বিভক্ত করতে পারি সুলতানী ও মোগল আমল। যেখানে বাংলার স্বাধীন সুলতানী যুগ গৌরবোজ্জল অধ্যায়ের সাক্ষর বহন করে।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম ১৯৫৯ সালের দিকে তাঁর অমর গ্রন্থ প্রকাশের পর থেকেই বাংলার মধ্যযুগের সমাজ সংস্কৃতি লেখক, গবেষক আর বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি সুখময় বন্দোপাধ্যায় ড.এম এ রহিম এবং সাম্প্রতিক গবেষকদের মধ্যে অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ এর গবেষণায় ধীরে ধীরে বাংলার মধ্যযুগ বিশেষত মধ্যযুগের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস একটি আলোর দিশা পায়। ড আবদুল করিমের গবেষণায় আমরা বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমল পর্যন্ত যেখানে রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। পরবর্তিকালে অধ্যাপক ড. শাহনাওয়াজ মধ্যযুগের মুদ্রা ও শিলালিপি বিশ্লেষণ করে সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে একটি বস্তুনিষ্ঠ ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তবে মুদ্রা ও শিলালিপি গুলো যেগুলো বিশেষত সুলতান বা সম্রাটদের দ্বারা জারি করা সেখানে রাজশাসন, শাসনের সময়কাল আর শাসণ কাঠামো সম্পর্কিত তথ্য যতটা সুন্দর ভাবে পাওয়া যায় সেখানে সমাজ সংস্কৃতির ধারণা করা অনেকটাই কঠিন। তবুও মুদ্রায় উৎকীর্ণ প্রতীক, চিহ্ন অলংকরণ প্রভৃতি থেকে সমাজ সংস্কৃতির নানা দিক সম্পর্কে ধারণা লাভ করে ঐ সময়ের প্রচলিত লোককথা-লোকগাথা বিভিন্ন ভ্রমণ-বৃত্তান্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে প্রতিতুলনা করে বাস্তব ইতিহাসের ধারণা লাভ করা সম্ভব। পরবর্তী পর্বে বাংলায় মুসলিম আগমন ও দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ এর ফলাফলের পাশাপাশি বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পটভূমি নিয়ে আলোচনা করা হবে।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
শিক্ষার্থ-গবেষক,প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
aurnabmaas@gmail.com
Archaeology Of Humankind