Category Archives: সমাজ

পৈশাচিক নেক্রোফিলিয়া বা শবাসক্তি (পর্ব-১)

প্SPN_Necrophiliaরত্নতত্ত্বে অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমরা অতীত রাজা রাজড়াদের নানা ধরণের অবাক করার মতো খেয়াল খুশির পরিচয় পাই। এর মধ্যে অদ্ভুদ কিছু বিষয় যেমন মানুষের চিত্তকে বিচলিত করে তেমনি কিছু বিষয় আছে যেগুলো শুনলে ঘৃণায় মুখ বিকৃত করতে হয়। আমার একটা অভ্যাস আছে অবসর সময়টুকু বেশিরভাগই কাটাই হয় বই পড়ে কিংবা নেটে ব্রাউজিং করে যেখানে প্রত্নতত্ত্ব আর ইতিহাসই কেন্দ্রে থাকে। আর প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই এটা আমাকে এতটাই টানে যে আমার লেখাপড়ার গণ্ডিটা অনেকটা প্রত্নতত্বের মধ্যেই কিভাবে যেন আটকে গেছে। জা. বি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে তখন তৃতীয় বর্ষের মাঝামাঝি পড়ি এমনটা হবে। একটি সংবাদপত্রে ফিচার লেখার প্রস্তাব পেয়ে মিশরীয় মমির কিছু ছবি দেখছিলাম। ফিচার লেখার তুলনায় আমার অনুসন্ধিৎসু চোখ নিবদ্ধ হয় একটি বিশেষ বিষয়ের প্রতি। তখন ঐ প্রবন্ধ শেষ করার কাজ অনেক পিছিয়ে যায়। আমি ভাবতে থাকি অন্য বিষয় নিয়ে। Continue reading পৈশাচিক নেক্রোফিলিয়া বা শবাসক্তি (পর্ব-১)

জ্যোতির্বিদ অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশের বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক ক্ষ্যাতিসম্পন্ন জ্যোতির্বিদ অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম। চট্টগ্রামের এক বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র ৭৪ বছর বয়সেই থমকে গেছে উনার জীবনচক্র। মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি নিয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন যা কেমব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়কেও আলোড়িত করেছিল। হাজারো বিবেকবর্জিত শিক্ষকনামের জড়পদার্থের ভিড়ে খুঁজে পাওয়া একটি উজ্জল নক্ষত্রকে হারালো বাংলাদেশ। কিছু শিক্ষক যেখানে নিজেদের জন্মস্থান পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সন্ত্রাসীদের আস্তানা বানিয়ে প্রাইভেটফার্মে মুর্গিচরাতে ব্যস্ত। ঠিক সেই দেশে জন্মেও টাকার কাছে বিবেক আর দেশের প্রতি ভালোবাসা বিক্রি করেন নাই শ্রদ্ধেয় জামাল নজরুল ইসলাম স্যার। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে তুচ্ছ ভেবে থেকে গেছেন দেশে, তাও চাটগাঁইয়া পাড়াতে। ভাবলৈতে ঢাকাতেও আসেননি।
বড় কষ্ট হয় যখন মান্যবর জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারদের মতো মানুষ বুয়েটের নুন খেয়ে এতো বড় হয়ে শেষ পর্যন্ত গুণ গান ব্রাকের। অবাক লাগে উনারা কিভাবে বলেন পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় নষ্টমির আখড়া। Continue reading জ্যোতির্বিদ অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম

প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বাণিজ্যিক সম্ভবনা ও চলচিত্র ভাবনায় নতুনত্ব।

চলচিত্র দৃশ্যপটে প্রত্নস্থান কান্তজিউর মন্দির

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই একটা বিষয় খারাপ লাগতো। আর্কিওলজি বালার পর পর পাব্লিক বলতো আর্কিটেকচার নাকি। কিংবা  দেখেছি নাম শোনা মাত্র মানুষ নাক কুঁচকে মুখটা ঈষৎ বাকিয়ে বলে এটা কি ??

পরে শুধুই ভাবতাম তোরা যে যা বলিস ভাই!! যেমনে হোক প্রত্নতত্ত্বের জন্য প্রচারণা চাই। এখন অনেক ভালো লাগে যখন দেখি ফেসবুকে খোলা কয়েকটি গ্রুপ আর পেজের হাজার হাজার লাইক-কমেন্ট জানান দেয় আমরা প্রত্নতত্ত্ব পড়ি।  তারপর আগ্রহী হয়েছিলাম কিভাবে এদেশের মিডিয়ায় প্রত্নস্থানগুলোকে জনপ্রিয় করে তোলা যায়। পাণ্ডিত্যের মোহে অন্ধ হয়ে প্রত্নস্থানগুলো কখনই পাদপ্রদীপে না আসুক এমনটি কখনো চাইতাম না। তাই একটু অন্যরকম করেই ভাবতে শুরু করি। এখন সময় পাল্টেছে কিছুদিন পর পর আমদের প্রত্নস্থানগুলোর উপর বেশ কিছু প্রামাণ্য চিত্র দেখানো হয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে। পত্রপত্রিকাতেও অনেক ফিচার আসে। কিন্তু ভারতীয় বাংলা আর হিন্দির সাথে দ্বৈরথে দিনের পর দিন পিছিয়ে পড়েছে আমাদের মিডিয়া। তার লেজ ধরে চলচিত্রেও আজ দৈন্যদশা। তাই চলচিত্র ভাবনায় নতুনত্ব এখন সময়ের দাবি । তাই এতোদিন শুধুই Continue reading প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বাণিজ্যিক সম্ভবনা ও চলচিত্র ভাবনায় নতুনত্ব।

নীলনদ মমি আর পিরামিডের দেশ

ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস ছিলেন গ্রিস দেশের অধিবাসী। প্রাচীন সভ্যতা দেখার আকর্ষণে একবার মিশরে আসেন। অবাক বিস্ময়ে মিশরীয় সভ্যতার নানা অবদান দেখে বুঝতে পেরেছিলেন এই সভ্যতা গড়ে তোলার পেছনে নীলনদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই তিনি মন্তব্য করেছেন ‘মিশর নীলনদের দান’। প্রকৃতপক্ষে নগর সভ্যতা গড়ে তুলতে মিশরকে প্রথম পথ দেখিয়েছে নীলনদ। নবোপলীয় যুগে মিশরের কৃষকরা কৃষিকাজ করতে গিয়ে নীলনদকে গভীরভাবে লক্ষ করেছে। তারা কখনো নীলনদকে দেখেছে জীবনের প্রতীক হিসেবে, কখনো বা ভয়ঙ্কর দৈত্য রূপে। নীলনদের জল সেচ করেই কৃষক ফসল ফলাতো। তখন নীলনদকে কৃষক দেখতো আশীর্বাদ হিসাবে। কিন্তু যখন বন্যার জল দু’কূল উপচে পড়তো তখন ভয়ার্ত কৃষক ভাবতোÑবুঝি নীলনদ কোন রাক্ষুসে দৈত্য। তীব্র স্রোতে কেমন গ্রাস করে নেয় লকলকে বেড়ে ওঠা ফসল।   Continue reading নীলনদ মমি আর পিরামিডের দেশ

কিছু কিছু কথা আর কিছু পরিচয়

ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় প্রতিদিন আমিন বাজারের কাছে জ্যামে পড়তে হয়। আজও অন্যথা হয়নি। বাসের জানালায় মাথা রেখে ঢুলছিলাম। হটাৎ কানে আসলো অলকা ইয়াগনিকের পরিচিত কণ্ঠস্বর। আশে পাশে তাকালাম কে যেন গানটা বাজাচ্ছে… এর আগে শোনা হয়নি। তবুও খারাপ লাগেনি। দুটো লাইন মনে ছিল।

সন্ধার পর নেটে সার্চ দিলাম। গুগল থেকে খুজেও পেলাম। গানটার কথা ছিল অনেকটা এমন

কিছু কিছু কথা আর কিছু পরিচয়……….

মনে মনে চুপি চুপি  দোলা দিয়ে যায়,

কিছু কিছু মুখের হাসি, দিয়ে যায় চাওয়ার বেশি।

ভরে যায় খুশিতে তখন এ হৃদয়।

আমি হটাৎ একটি গানকে কেনো টেনে আনলাম ???? Continue reading কিছু কিছু কথা আর কিছু পরিচয়

বটতলার সাহিত্য চর্চায় প্রথম আলো

সিনিয়রদের শুশীল সাজার তেব্র বাসনায় বাসাতে প্রথম আলোর এক কপি রাখা হলেও ওটার খেলার পাতা বাদ আর কিছু দেখি না। বিশেষ করে একমাত্র ফারুক ওয়াসিফ ভাইয়ের লেখা বাদে এডিটোরিয়ালের পাতা তো দেখাই হয় না। তবে এর একটা পাতা অনেক মনোযোগ দিয়ে দেখি। সত্যি তা দেখার মতো । তা হলো এর  খেলার পাতা। সেই সাথে মাঝে মাঝে বের করা সাময়িকীর মধ্যে রস আলো আর স্টেডিয়ামের প্রতি একটা অন্যরকম দুর্বলতা আছেই।

ইউরো ফুটবল শুরু হলো।  প্রিয় দল স্পেন হওয়াতে প্রথম আলোর স্টেডিয়াম পাতায় যে লেখা ছাপা হলো তা পড়তে ইচ্ছে হলো। ………..

সেখানে লেখা ছিল ….

গোধূলির আকাশের মতো লাজরাঙা সারা কার্বোনেরোকে দেখার জন্য আবারও প্রস্তুত হন। প্রস্তুতি নিন সেই রোমান্টিক দৃশ্যের জন্যও: কার্বোনেরোর গোলাপি সিক্ত ঠোঁটে ইকার ক্যাসিয়াসের প্রগাঢ় চুম্বন! Continue reading বটতলার সাহিত্য চর্চায় প্রথম আলো

সেকুলার ধারণার প্রসার ও বাংলার মধ্যযুগ

বাংলাদেশের ইতিহাস প্রকৃত অর্থে বাস্তবতা বিকৃতির ইতিহাস । এটি বললে অনেকেই আতকে উঠতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা বুঝতে পারলে তিনি সহজেই বিষয়টি মেনে নিতে পারবেন। আমাদের দেশের ইতিহাস গবেষকদের মূল সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্র বা সমস্যা চিহ্নিত করার দুঃসাহস আমি দেখাবো না শুধু এটুকু বলতে পারি। আমাদের দেশের ইতিহাস চর্চা অনেকটাই থেমে থাকে মধ্যযুগের প্রারম্ভ অর্থাৎ সুলতানী যুগ পর্যন্ত গিয়ে। এই ক্ষেত্রে বাংলার সুলতানী যুগের ইতিহাস অনেকটাই অধরা থেকে যায়। আমরা সুলতানী যুগের ইতিহাস বিশেষত হোসেনশাহী যুগের ইতিহাস অনুসন্ধান প্রসংগে বিষয়টি সহজেই বিশ্লেষণ করতে পারি। ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় আমরা দেখি তুর্কি বিজেতারা বারো শতকের শুরুতে ভারতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বিষয়ের সাথে হিসেব মেলাতে গেলে আরো বহুদিন পর প্রায় তের শতকের শুরুতে তাদের রাজনৈতিক সাফল্যের সূচনা ঘটে বাংলায়। বস্তুত বাংলার মধ্যযুগের যাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই যেটি আমাদের গবেষণা আর চর্চার অপারগতা হেতু অনেকটাই অন্ধকারে থেকে গেছে।
আমরা দেখি মধ্যযুগের কালপরিসরকে বড় দাগে দুটো পর্বে ভাগ করা যায়। Continue reading সেকুলার ধারণার প্রসার ও বাংলার মধ্যযুগ

এ লাশের মিছিল থামবে কবে?

মো. আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
সেদিন দৈনিক আমার দেশসহ দেশের প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় দেখলাম অভিশপ্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী কাজী লিয়াকত আলী যুবরাজের মৃত্যু সংবাদ, পর লিয়াকতের পথ অনুসরণ করেছেন আরও কয়েকজন। জানি না আত্মঘাতী এই লাশের মিছিল থামবে কবে! জীবন যখন কারও কাছে বোঝা হয়ে ওঠে, তখন সে ছুটি নিতে চায়। দৌড়ে পালিয়ে বাঁচতে চায়। প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘন করে এ দৌড় জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার দৌড়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে লোকসানের পর লোকসান পরিবার ও সমাজের কাছে লাঞ্ছনা আর হাহাকার সইতে না পেরে রাজধানীর গোপীবাগের আরকে মিশন রোডের ৬৪/৬-জে নম্বরে নিজগৃহে সিলিংফ্যানের সঙ্গে লটকে গেছেন লিয়াকত সাহেব। Continue reading এ লাশের মিছিল থামবে কবে?

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

গত ৩০ মে দৈনিক সমকালের উপসম্পাদকীয়তে আবু সাঈদ খানের ‘পুরাকীর্তি ধ্বংসের প্রক্রিয়া রুখতে হবে’ শিরোনামে লেখাটি পড়লাম। তিনি যতটা না পুরাতাত্তি্বক দৃষ্টিকোণ থেকে, তার থেকে অনেক বেশি স্বাধীন বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের পুরাতাত্তি্বক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতামূলক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ অর্থে তিনি অবশ্যই একান্ত কৃতজ্ঞতা ও সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার।
আবু সাঈদ খান বলতে চেয়েছেন, নতুন প্রজন্মকে অতীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে আমাদের সভ্যতা ও ঐতিহ্যের আবিষ্কার এবং সংরক্ষণে আজ ব্যাপক উদ্যোগ প্রয়োজন। আমি তার সঙ্গে এ ব্যাপারে পুরোপুরি ঐকমত্য পোষণ করে বিনয়ের সঙ্গে আরও কিছু বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আমাদের দেশের প্রচলিত পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইনটি দুর্বলতার কারণে বর্তমানে একটি অকার্যকর আইনে পরিণত হয়েছে। এখানে কিছু বিধিনিষেধ প্রকৃত অর্থে আইনের ফাঁকে পুরাকীর্তির ধ্বংসকেই বৈধতা দিয়েছে। অন্যদিকে জনসচেতনতার অভাব, ধর্মীয় গোঁড়ামি ইত্যাদি দেশের প্রত্নতাত্তি্বক ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একটি গোষ্ঠী হজরত শাহ সুলতান মাহী সওয়ারের মাজারকেন্দ্রিক লালসালু আখ্যানের বাস্তব রূপায়ণে মহাস্থানগড়ের বিরল প্রত্ননিদর্শন একের পর এক বিনষ্ট করে যাচ্ছে। পাহাড়পুরের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শন এখন গোচারণভূমি। গুপ্ত যুগের নিদর্শন ভরত ভায়নাতেও একই হারে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। ময়নামতির শালবন বিহারের প্রত্নস্থলের ভেতরে এখন সিনেমার শুটিং হয়। একদিন লালবাগ কেল্লায় গিয়ে মহাসমারোহে প্রত্নস্থানের মধ্যেই শুটিং হতে দেখলাম।
আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে, আমরা নিজেরাই আমাদের ঐতিহ্যের রূপকার। আর ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট হয়, আমাদের সংস্কৃতি কোনো বহিঃশক্তির কাছে প্রাপ্ত বা ধার করা নয়, নিজেদের সৃষ্টি। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে নিদর্শনগুলো আবিষ্কৃত হওয়ার পর আজ আর কোনো সংশয় নেই যে, যিশুর জন্মেরও বহুদিন আগে বাংলায় আমাদের পূর্বপুরুষরা সভ্যতার আলোকবর্তিকা প্রজ্বলনে সক্ষম হয়েছিলেন। কালের পরিক্রমায় ক্রমাগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এসেছে আজকের বাংলাদেশিদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি কখনও কখনও বিভিন্ন অপশক্তির করাল গ্রাসে তার ঔজ্জ্বল্য হারালেও একেবারে দীপ্তিহীন হয়ে যায়নি।
আমাদের নিজেদের অতীত সম্পর্কে আমরা যদি জানতে চেষ্টা করি, যদি গণসচেতনতা তৈরি করা সম্ভব হয় তবেই আমাদের হাজার বছরের এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারব। তবে প্রভাবশালী মহল, শিক্ষিত স্বার্থান্বেষী মহলের পাশাপাশি কিছু ব্যক্তির স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্রই যখন পুরাকীর্তি ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, পরিস্থিতি তখন সত্যিই তা এক ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করে। আবু সাঈদ খান তার প্রবন্ধে ময়নামতির পুরাকীর্তি ধ্বংস করে সেই ইট খুলে সরকারি ভবন নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা হরহামেশাই ঘটছে। সাম্প্রতিক কিছু মর্মান্তিক বিষয় হচ্ছে বগুড়ায় জেলা প্রশাসক কর্তৃক মোগল মসজিদ সম্প্রসারণ, বাগেরহাটে খানজাহান আলীর মাজার ঘেঁষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্ত্রীর কবর তৈরি, স্থানীয় সাংসদ কর্তৃক খানজাহান আলী মাজারসংলগ্ন পুকুরটি আধুনিক টাইলস দিয়ে মোড়ানো, মহাস্থানগড়ের পুরাকীর্তি ধ্বংস করে সেখানে মাজার সম্প্রসারণ, জৈন্তাপুরের মেগালিথিক সমাধির পাথর নিয়ে গিয়ে খাসিয়া পল্লীতে বাড়ির সিঁড়ি তৈরি, ভরত ভায়নায় ইট চুরি, ময়নামতিতে ইট চুরি, প্রত্নস্থানে নাটক-সিনেমার শুটিং করা প্রভৃতি। পুরাকীর্তি সংস্কারের নামে যখন ধ্বংসলীলা চালানো হয় তার পরিণাম আরও ভয়াবহ। পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইনকে অনেকে সময় বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রাচীন কীর্তির ওপরেই তাঁবু খাটানো, সংরক্ষিত এলাকায় অফিস, রেস্ট হাউস, বাসভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। আবার সংরক্ষণ ও উৎখননে যোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ না করা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকায় পুরাকীর্তি ধ্বংসের মাধ্যমে ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটছে। আমাদের দেশের জাতীয় জাদুঘরে কোনো প্রশিক্ষিত প্রত্নতাত্তি্বক নেই। দেশের একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রত্নতত্ত্ব শিক্ষাদান করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে জাদুঘর বিদ্যা মৌলিক অংশ হিসেবে কোর্স শিরোনামে উল্লেখ থাকলেও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে পাস করে বের হওয়া ছাত্রছাত্রীদের দেশের জাদুঘরগুলোতে উপেক্ষিতই রাখা হয়।
আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনি বিভিন্ন জাদুঘরে কী পরিমাণ পুরাকীর্তি রয়েছে, তার হিসাব প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে নেই। বেশিরভাগ অরক্ষিত নিদর্শনের কথা বাদ দিলেও জাদুঘরে রাখা নিদর্শনগুলোকে যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। আবু সাঈদ খান উলি্লখিত বিষয়ের সঙ্গে আমি যোগ করতে চাই (সমকাল, ২৯ মার্চ ২০১১-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন), জাতীয় জাদুঘর থেকে ১৬টি নিদর্শন খোয়া যাওয়ার পাশাপাশি বিগত ৩০ বছরে হারিয়েছে ১৭২টি নিদর্শন, যার কোনো স্পষ্ট তালিকাও পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিকভাবে দুর্বল দু’বছরের জন্য দেশের গণতন্ত্র হত্যাকারী ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন গংয়ের অরাজকতার শাসনকালে প্যারিসের গিমে জাদুঘরে দেশের ১৮৭টি পুরাকীর্তি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের সংস্কৃতি সচেতন মানুষ প্রায় সবাই এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। ফলে সেখানে পাঠানো ৪২টি নিদর্শন ফেরত আনা হলেও জাতির কাছে একটা বিষয় আজও ধোঁয়াচ্ছন্নই রয়ে গেছে_ ফেরত আনা নিদর্শনগুলো আসল, না নকল!
আমাদের জাতীয় পরিচয়কে তুলে ধরতে গেলে সভ্যতা ও ঐতিহ্যের আবিষ্কার এবং সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশিক্ষিত প্রত্নতাত্তি্বক, ভূতাত্তি্বক, প্রত্ন সংরক্ষণবিদ, প্রত্ন রসায়নবিদ, ভূ-প্রত্নতাত্তি্বক, দূর-অনুধাবন ও জরিপ বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন বিষয়ের অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সহায়তায় আমাদের দেশের বৈচিত্র্যময় এই সাংস্কৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ সম্ভব। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, বেনাপোল থেকে তামাবিল_ এই ছোট্ট ভূখণ্ডের অতীত যে কত সমৃদ্ধ তা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা একান্তভাবে কাম্য। পাশাপাশি দেশের মানুষকে যদি ঐতিহ্য-সচেতন করে তোলা যায়, তবে সরকারের কাজটি আরও সহজ ও সাবলীল হবে বলেই বিশ্বাস।

আনুষ্ঠানিকতা ও বাস্তবতা

বেরিয়েছিলাম সাতসকালেই ছায়ানটের শিল্পীদের পরিবেশনায় নতুন বছরকে বরণ করার উৎসবকে খুব কাছে থেকে দেখতে। সুবিশাল রমনায় যেন তিল ধারণের অবস্থা নেই। র‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি সিসিটিভি আর ডগ স্কোয়াডের বিশেষ নিরাপত্তার চাদরে মোড়া নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল চোখে পড়ার মতো। বাঁশির মনমাতানো সুরলহরি আর ঢাকের বাজনায় মুখরিত পরিবেশে যখন উৎসব শুরু হয় তখন বাঙালি জাতির একজন ভাবতেই নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়েছিল। টিএসসি ও এর আশপাশেই বাউল-লালন, জারি-সারি, মুর্শেদি গানের আসর বসেছে এর মধ্যেই। Continue reading আনুষ্ঠানিকতা ও বাস্তবতা